অমুসলিমরা কি নাপাক? আল কুরআন কি বলে?

অমুসলিমরা কি নাপাক? আল কুরআনের ভাষায়

ইবাদত ইসলাম প্রতিদিন কুরআন ও সুন্নাহ জীবন কথা প্রবন্ধ

অমুসলিমরা কি নাপাক?

یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْۤا اِنَّمَا الْمُشْرِكُوْنَ نَجَسٌ فَلَا یَقْرَبُوا الْمَسْجِدَ الْحَرَامَ بَعْدَ عَامِهِمْ هٰذَا ۚ وَ اِنْ خِفْتُمْ عَیْلَۃً فَسَوْفَ یُغْنِیْكُمُ اللهُ مِنْ فَضْلِهٖۤ اِنْ شَآءَ ؕ اِنَّ اللهَ عَلِیْمٌ حَکِیْمٌ

‘হে মুমিনগণ! মুশরিকরা তো অপবিত্র; সুতরাং এই বৎসরের পর তারা যেনো মসজিদুল হারামের নিকট না আসে। যদি তোমরা দারিদ্রের আশঙ্কা করো তবে আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাঁর নিজ করুণায় তোমাদেরকে অভাবমুক্ত করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।’ [তওবা : ২৮]

আলোচ্য আয়াতের ব্যাপারে কয়েকটি বিষয় প্রণিধানযোগ্য—
১. এখানে মুশরিক বলে শুধু মূর্তিপূজক উদ্দেশ্য নয়, যেমনটা ভি এইচ পিরা বলে থাকে। এখানে ওই সকল লোক উদ্দেশ্য যারা আল্লাহর যাত ও সিফাতের মাঝে অথবা তাঁর অধিকারে অংশীদার সাব্যস্ত করে। চাই তারা মূর্তিপূজক হোক বা কোনো নাবীকে আল্লাহর সমমর্যাদায় অভিসিক্ত করুক। অথবা আল্লাহর কোনো নেক বান্দাকে আল্লাহর কুদরতের অধিকারী মনে করুক। আল্লাহ না করুন যারা নিজেদের মুসলমান দাবি করে আবার গাইরুল্লাহকে আল্লাহর সমতুল্য মনে করে বা কোনো নবী ও অলির জন্য সেসব অধিকার সাব্যস্ত করে যেগুলো একান্তভাবে আল্লাহর। তারাও মুশরিক বলে গণ্য হবে।

২. ‘মুশরিকরা নাপাক’ বলে এটা উদ্দেশ্য নয় যে, তাদের দেহ নাপাক, কাপড়চোপড় নাপাক বা তাদের ঝুটা নাপাক। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অমুসলিমদের মেহমানদারী করেছেন। নিজেও তাদের দাওয়াত কবুল করেছেন। মসজিদে নববিতে তাদের থাকতে দিয়েছেন। নিজের বিছানায় বসতে শুতে দিয়েছেন। যদি তারা দৈহিকভাবে নাপাক হতো তাহলে তিনি এটা কীভাবে করলেন? সুতরাং বোঝা গেলো, এখানে দৈহিক নাপাক উদ্দেশ্য নয়; বরং বিশ্বাসগত নাপাক উদ্দেশ্য। যেমন আপনি কারো ব্যাপারে বলেন, তার উদ্দেশ্য নাপাক বা বলেন, ওমুক সন্ত্রাসীর নাপাক পরিকল্পনা ব্যর্থ করে দেয়া হয়েছে। এখানে নাপাক বলে চিন্তাচেতনা ও কর্মকাণ্ডগত নাপাক উদ্দেশ্য। আলোচ্য আয়াতে মুশরিকদের ভ্রান্ত চিন্তাচেতনা ও মন্দ কর্মকাণ্ডের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।

৩. আল্লাহর একত্ববাদের ঘোষণা এবং শিরকের প্রতিবাদ শুধু ইসলাম ধর্মে রয়েছে এমন নয়, বরং সমস্ত ধর্মের মূল শিক্ষা এটাই। বাইবেলে প্রায় জায়গায় শিরকের নিন্দা করা হয়েছে। আজ খৃস্টানরা যে তিনজনের সমষ্টিকে খোদার মানে (Trinity) বাইবেলে এই দাবির সমর্থনে কোনো প্রমাণ নেই। এজন্য তারা ভ্রান্ত ব্যাখ্যা করে বলে—তিনজন মিলে একজন। হিন্দু ধর্মগ্রন্থগুলোতেও আল্লাহ তাআলার ব্যাপারে অত্যন্ত জোরালো ভাষায় একত্ববাদের কথা বলা হয়েছে এবং শিরক প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। সেখানে আছে, আল্লাহ নিরাকার; তিনি একা পুরো পৃথিবী বেষ্টন করে আছেন। এ ব্যাপারে পণ্ডিত দিয়ানন্দ স্বরসতী নিজের কালজয়ী গ্রন্থ ‘সতীর্থ প্রকাশে’ মূর্তিপূজার বিরুদ্ধে যেসব প্রমাণ হিন্দুধর্মগ্রন্থের বরাতে পেশ করেছেন সেগুলো অত্যন্ত বাস্তব। এতে প্রতিয়মান হয় যে, আসল হিন্দুধর্ম একত্ববাদের ধর্ম; শিরকের ধর্ম নয়। সেই গ্রন্থের সূত্রে বেদের কতোগুলো উদ্ধৃতি এখানে পেশ করছি—

 তিনি সর্বত্র বিরাজমান, পাক—পবিত্র ও নিরাকার।

 আমি সর্বোচ্চ শক্তিমত্তা ও নাজ—নেয়ামতের মালিক। সূর্যের মতো আমি সমস্ত পৃথিবীকে আলোকিত করি। আমি কখনো পরাজিত হই না, কখনো মরি না। এই পৃথিবীর সমস্ত নেয়ামতের স্রষ্টা আমি। তোমরা আমাকেই মনে করো এই পৃথিবীর স্রষ্টা ও সূচনাকারী। হে জ্ঞানীগণ! তোমরা নাজ—নেয়ামত ও শান—শওকতের জন্য চেষ্টা—প্রচেষ্টা করো। জ্ঞান ও অন্যান্য নেয়ামতের জন্য আমার কাছে কাকুতি মিনতি করো। আমার সান্নিধ্য থেকে কখনো মুখ ফিরিয়ে নিও না।

ঋগ্বেদের এসব বর্ণনা কতোটা সারগর্ভ এবং একত্ববাদের ব্যাপারে কতোটা সুস্পষ্ট!

 হে মানবজাতি! আমার প্রকৃত প্রশংসা হলো সত্য কথা বলা। এমন প্রশংসাকারীকে আমি শাশ্বত জ্ঞান ও অন্যান্য নেয়ামত দ্বারা ধন্য করি। সুতরাং পৃথিবীতে যা কিছু বর্তমান সেসবের স্রষ্টা ও নিয়ন্ত্রক আমি। অতএব আমাকে ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করো না। আমার স্থানে অন্য কাউকে মাবুদ মনে করো না।

পণ্ডিত স্বরস্বতিজি কিনোপনশাদের সূত্রে আল্লাহ পাকের গুণাবলি এভাবে বর্ণনা করেন—

যাকে চোখে দেখা যায় না, তবে চোখ তাঁর কুদরত দেখতে সক্ষম, তাকে তোমরা খোদা মনে করো। মানুষ যেসব চাক্ষুষ জিনিসের ইবাদত করে সেগুলো খোদা নয়।

হিন্দুধর্মের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থের মাধ্যমে স্পষ্ট প্রতিয়মান হয় যে, আল্লাহকে এক মানা এবং তার সঙ্গে কাউকে শরিক না করাই আসল হিন্দুধর্ম। সুতরাং মুশরিকদেরকে নাপাক বলার উদ্দেশ্য হলো, যে নিজেকে হিন্দু মনে করে কিন্তু আসল হিন্দু ধর্মের ওপর আমল করে না বা যে নিজেকে ইহুদি মনে করে কিন্তু আসল ইহুদি ধর্মের ওপর আমল করে না, অথবা যে নিজেকে খৃস্টান মনে করে কিন্তু হযরত ঈসা আ.—এর আসল শিক্ষার ওপর আমল করে না, অথবা যে নিজেকে মুসলমান মনে করে কিন্তু তার বিশ্বাস ইসলামি শিক্ষা মোতাবেক নয়, তারা সবাই নিজেদের আকীদা—বিশ্বাসের ক্ষেত্রে নাপাক।

 যারা কোনো ধর্মে বিশ্বাস রাখে কিন্তু ধর্মের আসল শিক্ষার ওপর আমল করে না, সব ধর্মেই তাদেরকে মন্দ নামে ডাকা হয়। যারা বাইবেল অধ্যয়ন করেছেন বিষয়টা তারা ভালো জানেন। সেখানে মুশরিকদের বিভিন্ন অভিধায় ডাকা হয়েছে। তাদের ব্যাপারে ব্যভিচারি, জিনাকার, নির্লজ্জ, বদকার ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। হিন্দু ধর্মগ্রন্থে ধর্মের অবাধ্যদের অত্যন্ত কঠিন ভাষায় তিরস্কার করা হয়েছে। বেদে হিন্দুস্তানের আসল কালো বাসিন্দাদের বৈশ্য ও দাস নামে অবিহিত করা হয়েছে। যারা আড়িয়াদের ধর্ম মানে না তাদের ব্যাপারে বেদের শব্দাবলি দেখুন—

 আমাদের আশপাশে ওইসব বৈশ্য আছে যাদের কোনো ধর্ম নেই; তারা নির্বোধ, মানবতাহীন।

 হে বাহাদুর! তুমি যুদ্ধ—বিগ্রহে বলদের মতো চোয়ালওলা দাসদের জাদুটোনা পর্যন্ত পরাজিত করে দিয়েছো।

তুমি নিজের হাতিয়ারের মাধ্যমে নির্লজ্জ বৈশ্যদের হত্যা করেছো। কোথাও তাদেরকে ‘কালোমুখো’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কোথাও ‘ঘুণে খাওয়া গাছ’ বলা হয়েছে। কোথাও ‘কালো ভূত’ আখ্যা দেয়া হয়েছে। বেদে অধার্মিক লোকদের লোভী, রাক্ষস, খবিস ও দুশমন ইত্যাদি আখ্যা দেয়া হয়েছে।

এখন ইনসাফের দৃষ্টিতে দেখুন, কুরআনে তো মাত্র এক জায়গায় মুশরিকদের নাপাক বলা হয়েছে। অথচ বেদে ধর্মবিরোধীদের খবিস, বলদের মতে চোয়ালওয়ালা, নির্লজ্জ, কালোমুখো, নির্বোধ, মনুষ্যত্ববর্জিত, বদজাত, পাপী, লোভী ও রাক্ষুস ইত্যাদি আখ্যা দেয়া হয়েছে। অথর্ব বেদে অধার্মিক লোকদের জন্য হুবহু নাপাক শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে।

ইয়াতুধানুদের অন্তর তীরের মাধ্যমে ছিদ্র করে ফেলো এবং তাদের বাহু যা তোমার ওপর আক্রমণোদ্যত ভেঙ্গে ফেল। হে অগ্নি! সেই শয়তানগুলোর সামনে জ্বলে ওঠো। তাদের মেরে ফেলো। শবখোর চিত্রল গাধা যেনো তাদের খায়। সেই নাপাকদের নরখাদকদের মতো তাক করে তাদের উপরের তিন অঙ্গ কেটে দাও।

 এসব ছিল অধার্মিক লোকদের দেয়া অভিধা। মনুজির শিক্ষা আকীদা—বিশ্বাসের ভিত্তিতে নয়, বরং বংশ—খান্দানের ভিত্তিতে শুদ্রদের অত্যন্ত নোংরা ও লাঞ্ছনাদায়ক অপবাদ দেয়া হয়েছে। তাদের ব্যাপারে এমন সব বিধান প্রণয়ন করা হয়েছে যাতে অনুমিত হয় শুদ্ররা দৈহিকভাবেও পেশাব পায়খানার মতো নাপাক ও বর্জনযোগ্য। এ ব্যাপারে হিন্দুদের প্রামাণ্য গ্রন্থেসমূহে এমন কথা আছে যেগুলো উল্লেখ করা হলে আরেকটি গ্রন্থ হয়ে যাবে। দৃষ্টান্ত স্বরূপ কিছু উল্লেখ করা হলো—

 হাতি, ঘোড়া ও ঘৃণাযোগ্য মেস্নচ্ছ শুদ্র, বাঘ, চিতা ও শুকর এসব প্রাণী পুনর্জন্মে এমন নিম্ন স্তরের হবে যা অন্ধকারের মাধ্যমে হয়ে থাকে।

 শুদ্রদের খাবার খাবে না।

 শুদ্র মেয়েকে নিজের পালঙ্কে বসালে নরকে যেতে হবে।

 যদি কোনো ব্রাহ্মণ ভুলে শুদ্রের খাবার খেয়ে ফেলে তাহলে তিনদিন পর্যন্ত উপবাস করবে। আর যদি জেনেবুঝে খেয়ে থাকে তাহলে এর কাফফারা সেটাই—হায়েয, পেশাব ও পায়খানা পানকারীর কাফফরা যেমন।

 শুকরের দুর্গন্ধে, কুকুরের দৃষ্টিতে, শুদ্রের ছোঁয়ায় খাবার নোংরা ও অপবিত্র হয়ে যায়।

 শুধু মনু সংহিতা নয়, বরং বেদের কতক বাণীও এমন পাওয়া যায়। অনুমান করুন, হিন্দুধর্মের প্রামাণ্য গ্রন্থগুলোতে মানবজাতির এক শ্রেণিকে কতোটা নীচু দৃষ্টিতে দেখা হয়!

এতদ্সত্ত্বেও আমার সুদৃঢ় বিশ্বাস—হিন্দুদের আসল ধর্মগ্রন্থে এমন নীতিহীন ও মানবতাবিরোধী কথা নেই। এটা হয়েছে মূলত ধর্মগ্রন্থগুলোর বিকৃতি ও মিশ্রণের ফলে। হিন্দুধর্মে বর্ণিত পুরোহিত ও ধর্মগুরুদের ব্যাপারে আমাদের বিশ্বাস আছে, তারা এমন অমানবিক কথা বলতে পারেন না। নিঃসন্দেহে এসব অনৈতিক কথা কিছু লোক অন্যদের মূলোৎপাটনের জন্য এবং নিজেদের অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থের জন্য ধর্মগ্রন্থে অন্তভুর্ক্ত করে দিয়েছে।

আল্লাহর আইন শাশ্বত ও চিরন্তন

মহানবী জগতের আদর্শ মহামানব। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ

Leave a Reply

Your email address will not be published.