আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআত

আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআত বা মুক্তি প্রাপ্ত দলের আকিদা

আক্বীদা ও ফেকাহ ইসলাম প্রতিদিন প্রবন্ধ

আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআত বা মুক্তি প্রাপ্ত দলের আকিদা

আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআত বা মুক্তি প্রাপ্ত দলের আকিদা—বিশ্বাস, নীতি ও কর্মধারা” বিষয়ক সেমিনারের প্রবন্ধ

الحمد لله الذي هدنا لهذا وما كنا لنهتدي لولا ان هدنا الله اما بعد  فقد قال رسول الله صلى الله عليه و سلم : ” وإن بني إسرائيل تفرقت على ثنتين وسبعين ملة وتفترق أمتي على ثلاث وسبعين ملة كلهم في النار إلا ملة واحدة قالوا ومن هي يا رسول الله قال ما أنا عليه وأصحابي ” . رواه الترمذي

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের সংজ্ঞা:

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত বলতে  ঐ দল বা জামাআতকে বুঝায়, যারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবায়ে কিরাম রাযি. এর পথ ও মতের অনুসরী হয়।

আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাযি. থেকে বর্ণিত এক হাদীসে এসেছে—

وإن بني إسرائيل تفرقت على ثنتين وسبعين ملة وتفترق أمتي على ثلاث وسبعين ملة كلهم في النار إلا ملة واحدة قالوا ومن هي يا رسول الله قال ما أنا عليه وأصحابي ” . رواه الترمذي

ইবনে ওমর রাযি. থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, “বনি ইসরাঈল বাহাত্তর দলে বিভক্ত হয়েছিল। আমার উম্মত তিহাত্তর দলে বিভক্ত হবে। তম্মধ্যে এক দল ব্যতীত আর সকলে জাহান্নাবে যাবে। সাহাবায়ে কিরাম জিজ্ঞাসা করলেন, মুক্তি প্রাপ্ত দলটি কারা? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জবাবে বললেন, তারা হল ঐ দল, যারা আমার ও আমার সাহাবীদের মত ও পথের অনুসারী।”

এ হাদীসে হক পন্থী তথা মুক্তিপ্রাপ্ত ও জান্নাতী দলের পরিচয়ে বলা হয়েছে :  ما أنا عليه وأصحابي “যারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবীদের মত ও পথের অনুসারী।” পরিভাষায় এদেরকে বলা হয় “আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআত”। এই “আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআত” বহির্ভূত যাবতীয় দল হল বাতিল বা গোমরাহ সম্প্রদায়ভূক্ত।

সুতরাং হক পন্থী ও জান্নাতী দলের অন্তর্ভূক্ত হওয়া ও থাকার জন্য যেমন ইসলামের সহীহ আকীদা—বিশ্বাস তথা আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআত এর আকীদা—বিশ্বাস সম্পর্কে অবগতি লাভ করা ও তার অনুসারী হওয়া প্রয়োজন, তদ্রুপ বাতিল সম্প্রদায়ের আকীদা—বিশ্বাস সম্পর্কে অবগতি লাভ পূর্বক তা থেকে বিরত থাকাও প্রয়োজন।

আকায়েদ

‘আকীদা’র শাব্দিক অর্থ কোন বিষয়ে দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করা। ইসলামের পরিভাষায় আকীদার অর্থ দৃঢ় মজবুত ঈমান, অকাট্য প্রমাণভিত্তিক খবরাখবর ও বিষয়াবলীর প্রতি মনের অটল বিশ্বাস। ‘আকীদা’ শব্দের বহুবচন হল আকায়েদ। অর্থাৎ মনের অটল বিশ্বাস। এই আকীদাই ঈমানের মূল। আকীদার মধ্যে বিন্দু মাত্র সন্দেহ আনলেই মানুষ বেঈমান হয়ে যায় এবং চিরকালের জন্য দোযখী হতে হয়। যার আকীদা ঠিক নাই তার কখনও মুক্তি নাই। পক্ষান্তরে যার আকীদা ঠিক থাকবে, অন্যান্য পাপের শাস্তি ভোগ করে সে মুক্তি লাভ করবে।

নিম্নে ইসলামের কিছু গুরুত্বপুর্ণ আকিদা দেওয়া হল-

আল্লাহ তা‘আলার সম্পর্কে আকায়েদ

১. আল্লাহ তা‘আলার জাত ও অস্তিত্বের উপর বিশ্বাস করা।    আল্লাহ তা‘আলার জাত সম্পর্কে এই বিশ্বাস রাখা যে, তিনি  এক ও অদ্বিতীয়। তিনিই একমাত্র ইবাদতের উপযুক্ত। তার কোনো শরীক নেই। তার সমকক্ষ কেউ নেই। তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন। তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং কারো থেকে জন্ম নেননি। তিনি চিরঞ্জিব। তিনিই আদি ও অন্ত।

২. আল্লাহ তা‘আলার সকল গুণাবলী বিশ্বাস করা। আল্লাহ তা‘আলার জাতের মতো তার সিফাত বা গুণাবলীতের তিনি একক ও অদ্বিতীয়। হাদীসে আল্লাহ তা‘আলার ৯৯টি গুণবাচক নাম এসেছে। এসবগুলির উপর অকাট্য বিশ্বাস রাখা।

৩.       আল্লাহ তা‘আলার তাঁর জাত ও সকল গুণাবলীসহ এক ও অদ্বিতীয় হওয়াকে বিশ্বাস করা।

৪.       আল্লাহ তা‘আলার সমস্ত হুকুম যেমন- নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত ইত্যাদিকে অবশ্য পালনীয় মনে করা।

ফেরেস্তা সম্পর্কে আকায়েদ

৫.       সমস্ত ফেরেশতার উপর এই বিশ্বাস করা যে, তারা আল্লাহ তা‘আলার মাখলুক, নূরের তৈরী ও নিষ্পাপ। তাঁরা আল্লাহর নির্দেশের বিরুদ্ধাচরণ করেন না। বরং সর্বদা আল্লাহর নির্দেশ পালনে রত থাকেন। তাঁদের মধ্যে প্রধান চারজন হলেনÑ ক. হযরত জিবরাঈল (আ.), খ. হযরত মিকাঈল (আ.) গ. হযরত ইস্রাফীল (আ.) এবং ঘ. হযরত আজরাঈল (আ.)।

তারা পুরুষও নন নারীও নন। তারা কাম, রিপু, ক্রোধ, লোভ ইত্যাদি রিপু থেকে মুক্ত।

তারা বিভিন্ন আকার ধারন করতে পারেন, তাদেও কোন সন্তানাদি নেই। তারা সংখ্যায় অনেক। তাদেও প্রকৃত সংখ্যা আল্লাহ ব্যতীত কারও জানা নেই। তাদেরকে আল্লাহ বিপুল শক্তির অধিকারী বানিয়েছেন।

ফেরেস্তাগণ মাসুম বা নিস্পাপ। সর্বদা আল্লাহর নির্দেশ মোতাবেক কার্য সম্পাদন করে থাকেন।

নবী  সম্পর্কে আকায়েদ

জিন ও ইনসানের হেদায়েতের জন্য আল্লাহ তা‘আলা আসমান থেকে যে কিতাব প্রেরণ করেন, সেই কিতাবের ধারক বাহক বানিয়ে, সেই কিতাব বুঝানো ও ব্যাখ্যা দেয়ার জন্য তথা আল্লাহর বানী হুবহু পৌছেদেয়ার জন্য এবং আমল করে আদর্শ দেখানোর জন্য আল্লাহ তা‘আলা নির্দিষ্ট সংখ্যক মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং জিন ও মানব জাতির নিকট তাদেরকে প্রেরণ করেছেন। তাঁদেরকে বলা হয় নবী বা রাসূল।

৬.       হযরত আদম (আ.) থেকে হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত আল্লাহ তা‘আলার প্রেরিত সকল নবী ও রাসূলকে হক মনে করা।

নবুওয়াত ও রেসালাত আল্লাহর দান। আল্লাহ যাকে চান তাকেই তিনি নবী রাসুল হিসেবে মনোনিত করেন।

৭. নবীদেরকে মা’সুম অর্থাৎ নিষ্পাপ মনে করা।

৮.       নবীগণ মানুষ; তাঁরা ইলাহ নন, আল্লাহ তা‘আলার পুত্র বা রূপান্তরও নন; বরং তাঁরা আল্লাহ তা‘আলার বান্দা ও প্রতিনিধি। জিন ও মানুষ জাতিকে হেদায়েতের জন্য তারা দুনিয়াতে প্রেরিত হন। যারা নবী ঈসা আলাইহিস সালামকে  খোদা বা নবী ঈসা ও উযায়ের আঃ কে  খোদার পুত্র বলেছে তারা কুফুরী করেছে।

আল্লাহ বলেন, 

لقد كفر الذين قالوا ان الله هو المسيح ابن الله 

অর্থ : যারা বলে মারয়াম তনয় মসীহই আল্লাহ তারাতো কুফুরী করেছে ( সুরা মায়িদা ১৭)

قالت اليهود عزير ابن الله وقالت النصاري المسيح ابن الله ذالك قولهم بافواههم

অথার্ৎ, ইয়াহুহীগণ বলে উযায়ের আল্লাহর পুত্র এবং নাসারাগণ বলে মাসীহ আল্লাহর পুত্র। এটা তাদের মুখের কথা।

৯.       নবীগণ আল্লাহ তা‘আলার বাণী হুবাহু উম্মতের নিকট পেঁৗছিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে,

 الذين يبلغون رسالات الله و يخشونه و لا يخشون احدا الا الله

অথার্ৎ, তাঁরা আল্লাহর বাণী প্রচার করত এবং তাকে ভয় করত, আর আল্লাহকে ব্যতীত অন্য কাউকে ভয় করত না।

১০.      হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ নবী।

১১. নবীগণ কবরে জীবিত, আমাদের নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও রওজা শরীফে জীবিত আছেন।

১২.      নবীদের মাধ্যমে যে সমস্ত মু‘জেযা অর্থাৎ অলৌকিক ঘটনা ঘটেছে, সব সত্য বলে বিশ্বাস করা।

১৩. মে’রাজকে বিশ্বাস করা।

১৪. সমস্ত আসমানী কিতাবকে বিশ্বাস করা।

১৫. সমস্ত আসমানী কিতাবকে আল্লাহ তা‘আলার বাণী মনে করা।

১৬.      আল্লাহ তা‘আলা যেমন চিরন্তন, তাঁর বাণীও তেমন চিরন্তন, ক্ষণস্থায়ী নয়Ñ একথা বিশ্বাস করা।

১৭.      সমস্ত আসমানী কিতাবের মধ্যে কুরআন শরীফকে সর্বশ্রেষ্ঠ কিতাব মনে করা।

১৮.      সমস্ত আসমানী কিতাবের মধ্যে কুরআন শরীফ হলো সর্বশেষ কিতাব, এরপর কোন কিতাব অবতীর্ণ হবে না।

১৯.      আল্লাহ তা‘আলা কুরআন শরীফকে হেফাযত করার অঙ্গীকার করেছেন, তাই কুরআন শরীফকে সর্বদা অবিকৃত মনে করা।

২০.     সকল সাহাবীকে ‘আদেল’ অর্থাৎ ন্যায়পরায়ন ও সমালোচনার ঊর্ধ্বে মনে করা।

২১.      সকল সাহাবীর (রাযি.) প্রতি মহব্বত, ভক্তি শ্রদ্ধা রাখা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের অন্যতম শে’আর বা প্রতীক।

২২.     সাহাবায়ে কেরাম (রাযি.)—এর সকলকে মর্তবার দিক দিয়ে অলি—আউলিয়াদের ঊর্ধ্বে মনে করা।

২৩. সকল সাহাবীর (রাযি.) মধ্যে প্রধান চারজন হলেন-

ক. হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাযি.), খ. হযরত উমর ফারুক (রাযি.), গ. হযরত উসমান গণী (রাযি.) এবং ঘ. হযরত আলী (রাযি.)।

২৪.      সকল সাহাবীর (রাযি.) প্রতি আল্লাহ তা‘আলার চির সন্তুষ্টি ও খোশ—খবরীকে বিশ্বাস করা।

২৫. আখেরাতকে বিশ্বাস করা।

২৬. কবরের সুয়াল—জওয়াবকে বিশ্বাস করা।

২৭. কবরের আযাবকে বিশ্বাস করা।

২৮. হাশরের ময়দানে হাজির হওয়াকে বিশ্বাস করা।

২৯. আল্লাহ তা‘আলার বিচার, হিসাব—নিকাশকে বিশ্বাস করা।

৩০. নেকী—বদির ওজন হওয়াকে বিশ্বাস করা।

৩১. আমলনামা প্রাপ্তিকে বিশ্বাস করা।

৩২. হাউজে কাউছারকে বিশ্বাস করা।

৩৩. পুলসেরাতকে বিশ্বাস করা।

৩৪. শাফাআতকে বিশ্বাস করা।

৩৫. জান্নাতকে বিশ্বাস করা।

৩৬. জাহান্নামকে বিশ্বাস করা।

৩৭. তকদীরকে বিশ্বাস করা।

৩৮. আরশ—কুরছিকে বিশ্বাস করা।

৩৯. আল্লাহ তা‘আলার দীদারকে বিশ্বাস করা।

৪০. কেয়ামতের ছোট—বড় সকল আলামতকে বিশ্বাস করা।

৪১. হযরত ইমাম মাহদী (আ.)—এর আগমনকে বিশ্বাস করা।

৪২. হযরত ঈসা (আ.)—এর আগমনকে বিশ্বাস করা।

৪৩. দাজ্জালের ফেতনা ও তার আবির্ভাবকে বিশ্বাস করা।

৪৪. কেয়ামতের পূর্বে ইয়াজুজ—মাজুজ—এর আবির্ভাবকে বিশ্বাস করা।

৪৫. কেয়ামতের পূর্বে পশ্চিম দিক হতে সূর্যোদয় হওয়াকে বিশ্বাস করা।

৪৬.     কেয়ামতের আগে দাব্বাতুল আর্দ (মাটির নীচ হতে অদ্ভুত ধরনের এক জীব)—এর আবির্ভাবকে বিশ্বাস করা ।

৪৭.  জিন—জাতি আগুনের তৈরি, তারা আল্লাহ তা‘আলার মাখলুক, তারা গায়েব জানে না, বিশ্বাস করা।

৪৮. আউলিয়ায়ে কেরামের কাশফ ও এলহামকে বিশ্বাস করা।

৪৯. পীর, ফকীর, মাজার ইত্যাদিকে সিজদা করা হারাম বিশ্বাস করা।

৫০. ইসালে সওয়াব ও নেক বান্দাদের অসীলাকে সহীহ মনে করা।

৫১. প্রসিদ্ধ চার মাযহাব ও চার তরীকাকে সুন্নাত মোয়াফেক মনে করা।

(আহকামে জিন্দেগী ১ম অধ্যায়)

আদর্শ সেনানায়ক মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। ড. এ. কে. এম. আইয়ুব আলী

আরো সুন্দর সুন্দর আর্টিকেল পড়তে ভিজিট করুন আমাদের সাইটে- ক্লিক করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.