উলামায়ে কেরাম

উলামায়ে কেরাম : মর্যাদা, দা‌য়িত্ব ও কর্তব্য

আকাবির-আসলাফ ইসলাম প্রতিদিন প্রবন্ধ

উলামায়ে কেরাম : মর্যাদা, দা‌য়িত্ব ও কর্তব‌্য
শিক্ষাজীবন প্রত্যেক মানুষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ও অমূল্য জীবনকাল। এই শিক্ষাজীবনই মানুষের উৎকর্ষ সাধনের শ্রেষ্ঠ সময় ও আলোকোজ্জ্বল জীবনসৌধের বুনিয়াদ। কারণ মানুষের জীবনে তাকওয়ার উজ্জীবনী শক্তি, ঈমানী চৈতন্যবোধের উদ্ভব, ধর্মীয় বিশ্বাসে গড়া মহৎ জীবন, মানবিকতার বিকাশ, সদাচরণ এবং উন্নত নীতি-নৈতিকতা জাগরণের মৌলিক ভীত রচিত হয় ইলমে অহীর ছায়ায় অতিবাহিত শিক্ষাজীবন হতে। ইখলাস, আধ্যাত্মিকতা, তালীম-তরবিয়্যাত ও ইলম-আমলের সমন্বিত জীবনধারা থেকে । শিক্ষাজীবনই মানুষকে ভ্রষ্টতা ও মূর্খতার অন্ধকার হতে ঈমান ও হেদায়াতের আলোয় উদ্ভাসিত করে। অধঃপতনের গহ্বর হতে মুক্তির চূড়ায় উপনীত করে। -প্রবৃত্তির মোহ ছিন্ন করে দ্বীনের সরল-সঠিক পথে ধাবিত করে। পার্থিব কল্যাণ ও পরকালীন সফলতা লাভে আল্লাহ ও রাসূলের নির্দেশিত সঠিক পথ ও মতের উপর অবিচল জীবন ধারণের জন্য এই শিক্ষাজীবনের কোনো বিকল্প নেই। এ জন্যই কুরআন-হাদীসে এই শিক্ষা ও শিক্ষাজীবন এক অনন্য মর্যাদা ও গৌরবে মহিমান্বিত হয়েছে। এই শিক্ষার বাহকরা এক অভাবিত উচ্চমর্যাদা, শ্রেষ্ঠত্ব ও স্বতন্ত্রগুণে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হয়ে আছে ।

যেমন আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন-

يرفع الله الذين آمنوا منكم والذين أوتوا العلم درجات والله بما تعملون خبير

‘তোমাদের মধ্যে যারা ঈমানদার আল্লাহ তাদের মর্যাদা উচ্চ করে দিবেন, আর যারা জ্ঞানী তারা অধিক মর্যাদাবান। -সূরা মুজাদালা: ১১

قال ابن مسعود: مدح الله العلماء في هذه الآية

عن ابن عباس انه قال في تفسير هذه الآية : يرفع الله الذين امنوا منكم واوتوا العلم على الذين امنوا ولم يؤتوا العلم درجات وقال في موضع آخر : للعلماء درجات فوق المؤمنين بسبعمائة درجة ما بين الدرجتين مسيرة خمسمائة عام

عن الضحاك قال : إن للعلماء درجات كدرجات الشہداء

এ আয়াত প্রসঙ্গে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, আল্লাহ তাআলা এই আয়াতে উলামায়ে কেরামের প্রশংসা করেছেন । হযরত ইবনে আব্বাস রা. বলেন, মুমিনদের মধ্যে যারা ঐশীজ্ঞান প্রাপ্ত তাদের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব সাধারণ মুমিনদের চেয়ে অধিক। তিনি আরো বলেন, সাধারণ মুমিনদের উপর আলেমদের মর্যাদা সাতশ স্তর বৃদ্ধি করে দেয়া হবে। প্রতি দুই স্তরের মাঝে দূরত্ব হবে পাঁচশ বছর।

ইমাম যাহহাক রহ. বলেন, আলেমদের মর্যাদা হবে শহীদদের মর্যাদার সমান। (দ্রষ্টব্য : তাফসীরে ইবনে আবি হাতিম, তাফসীরে দুররে মনসুর, তাফসীরে কুরতুবী |
এ প্রসঙ্গে হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

من جاءه الموت وهو يطلب العلم ليحيى به الإسلام فبينه وبين النبيين درجة واحدة في الجنة

অর্থাৎ যে ব্যক্তি ইসলাম প্রতিষ্ঠা করার জন্য জ্ঞান অর্জন করে, জান্নাতে তার ও নবীদের মাঝে এক স্তরের ব্যবধান থাকবে। সুনানে দারামী, হাদীস : ৩৫৪

একটি স্বার্থক সুন্দর শিক্ষাজীবনের মহিমা তখনই অর্জিত হয়, যখন সেই শিক্ষার প্রভাব-প্রতিক্রিয়া অস্তর ও জীবনাচারে পরিস্ফুট হয়। খোদাভীতি, একনিষ্ঠতা এবং আমলের মাধ্যমে শিক্ষার অনুশীলন হয়। তখনই শিক্ষালাভকারী ব্যক্তি কুরআন-হাদীসে বর্ণিত ‘আলেম’ অভিধার উপযোগী হয়। আল্লাহ তাআলা স্বীয় পবিত্রগ্রন্থ কুরআন মজীদে তাদের সম্পর্কে বলেন-

انما يخشى الله من عباده العلماء

আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে জ্ঞানীরাই কেবল তাকে ভয় করে। -সূরা ফাতির : ২৮

আলেম-উলামাদেরকে নবীদের উত্তরাধিকারী বানানো হয়েছে এই জ্ঞান ও শিক্ষার কারণে। এ কারণে মুফতী মুহাম্মদ শফী রহ. বলেন, ইলম হলো আল্লাহ ভীতির অপর নাম। যে ইলম অর্জিত হলে খোদাভীতি ও আমলের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হয় এবং তার আত্মা প্রশান্তি লাভ করে, সেটাই হলো ইলমের নূর।

আলেমের মধ্যে যখন আল্লাহর ভয় সৃষ্টি হয় এবং সত্যিকারভাবে আল্লাহকে ভয় করে, তাহলে দুনিয়ার সব কিছুই তাকে ভয় করবে। হযরত আনাস রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

العالم إذا أراد بعلمه وجه الله هابه كل شئ . وإذا أراد أن يكثر به الكنوز هاب من كل شئ

আলেম যখন একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ইলম অর্জন করে, তখন দুনিয়ার সব কিছুই তাকে ভয় করে। আর যখন সে এই ইলম দ্বারা পার্থিব ধন সম্পদ সঞ্চয়ের কামনা করে তাহলে দুনিয়ার সবকিছুই তার ভয়ের কারণ হবে। –আল-জামে খতীব বাগদাদী, হাদীস : ৮৩৭; তারিখে ইবনে আসাকির, ৫৩/১৩২; কানযুল উম্মাল: ৪৬১৩১

অনুরূপভাবে এর বিপরীত আচরণকারী সর্বত্র নিন্দিত হয়। এই ইলম ও আমল সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে বলে হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে। ‘তুমি যা ইলম অর্জন করেছো, সে মতে কি আমল করেছো ?-এ প্রশ্নের উত্তর বিনে আল্লাহর সম্মুখ হতে কোনো বান্দা তার দু’টি পা একটুও অগ্রসর করতে পারবে না । -সুনানে তিরমিযি, হাদীস- ২৪১৬

আল্লাহ তাআলা উলামায়ে কেরাম কে তাদের জ্ঞান ও নেক আমলের বদৌলতে দ্বীনের ইমাম ও নেতা বানিয়েছেন। দ্বীনের বিষয়ে কারো ইমামতি ও নেতৃত্ব লাভ তার মহান মর্যাদা ও অনেক বড় মাহাত্মের পরিচয়। উলামায়ে কেরাম কে আল্লাহ সেই উঁচু মর্যাদা ও গৌরবে ভূষিত করেছেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-

وجعلنا منهم أئمة يهدون بأمرنا لما صبروا وكانوا بآياتنا يوقنون

অর্থ : আমি তাদের মধ্য হতে নেতা মনোনিত করেছিলাম যারা আমার নির্দেশ অনুসারে পথ প্রদর্শন করত, যেহেতু তারা ধৈর্যধারণ করেছিল । তারা ছিল আমার নিদর্শনাবলীতে দৃঢ় বিশ্বাসী। -সূরা সাজদা : ২৪

বনী ইসরাঈলের কতক আলেমকে জাতির নেতা ও অগ্রপথিকের মর্যাদায় উন্নীত করা হয়েছে দুটি কারণে-১. ধৈর্যধারণ করা ২. আল্লাহর আয়াতসমূহের উপর অটল বিশ্বাস স্থাপন করা। এখানে সবর দ্বারা আল্লাহর আদেশসমূহ পালনে অটল ও দৃঢ়পদ থাকা এবং আল্লাহ পাক যেসব বস্তু ও কাজ হারাম ও গর্হিত বলে নির্দেশ করেছেন, সেগুলো থেকে বিরত থাকা।

শরীয়তের যাবতীয় নির্দেশাবলীই এর অন্তর্গত-যা এক বিরাট ও কর্মগত দক্ষতা ও সাফল্য। দ্বিতীয়ত, আল্লাহর আয়াতসমূহের উপর অটল বিশ্বাস স্থাপন করা। অর্থাৎ আয়াতসমূহের মর্ম অনুধাবন করা এবং পরিশেষে তার উপর পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করা- উভয়ই এর অন্তর্গত। এ এক বিরাট জ্ঞানগত দক্ষতা ও সাফল্য। মোটকথা, আল্লাহ পাকের নিকট নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের যোগ্য কেবল সেসব লোকই যারা কর্ম ও জ্ঞান উভয়দিকেই পূর্ণতা লাভ করেছে ।

এজন্য ইমাম ইবনে কাসীর রহ. বলেন- ধৈর্য ও দৃঢ় বিশ্বাসের মাধ্যমেই দ্বীনের ক্ষেত্রে নেতৃত্বের মর্যাদা লাভ করা যায় ।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন উলামায়ে কেরাম কে আরো বিশেষ বৈশিষ্ট্য ও অনন্য মর্যাদার মাধ্যমে সম্মানিত করেছেন। তাদেরকে আল্লাহর একত্ববাদের সর্ববৃহৎ সাক্ষ্য বা শাহাদাতে কুবরা-যা পূর্ববর্তী সকল আসমানী গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে-এর অংশীদার বানিয়েছেন। আল্লাহর পবিত্র সৃষ্টিজাত ফেরেশতাদের সাথে উলামায়ে কেরাম কে সম্পৃক্ত করেছেন।

ইমাম কুরতুবী রহ. বলেন- এই আয়াত ইলমের ফযীলত এবং উলামায়ে কেরাম এর সম্মান ও সুউচ্চ মর্যাদার প্রমাণস্বরূপ। যদি উলামায়ে কেরাম এর চোয়ে অধিকতর সম্মানিত কেউ থাকত, তাহলে আল্লাহ তাআলা অবশ্যই তাদেরকে আল্লাহ ও ফেরেশতাদের সাথে সংযোজন করতেন।

তাছাড়া এর দ্বারা উলামায়ে কেরাম সম্পর্কে আল্লাহ পাকের পক্ষ থেকে প্রশংসা ও তাদের নিষ্কলুষতা ও ন্যায়নিষ্ঠার কথা সাব্যস্ত হয়। কারণ আল্লাহ তাঁর একত্ববাদের ব্যাপারে তাদেরকেই সাক্ষী নির্ধারন করেছেন যারা তাঁর নিকট মর্যাদাপূর্ণ ও নিষ্ঠাবান ।

এসব আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ তাআলা উলামায়ে কেরাম কে দুনিয়া ও আখিরাতে অতুলনীয় সম্মান ও অসাধারণ মর্যাদা-বৈশিষ্ট্যের আসনে সমাসীন করেছেন।

উলামায়ে কেরামের দায়িত্ব ও কর্তব্য

উলামায়ে কেরাম ও দ্বীনের দাওয়াত

উপরোক্ত আয়াত ও হাদীসসমূহে বর্ণিত ‘আলেম-উলামা দ্বারা সেই ব্যক্তিবর্গই উদ্দেশ্য যারা হালাল-হারাম, বৈধ-অবৈধ বিষয়ে তথা দ্বীন ও শরীয়তের জ্ঞানে পারদর্শী, রাসূলের সুন্নাতের অনুসারী এবং নিজেদের ইলম অনুযায়ী আমলকারী । তারাই অনন্য মর্যাদার অধিকারী, আল্লাহর একত্ববাদের সাক্ষ্যদাতা, জাতির নেতা, ইমাম ও নবীদের উত্তরাধিকারী । মুফাসসির ও মুহাদ্দিসগণ আলেমের এ পরিচয়ই পেশ করেছেন। এই গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্যের অধিকারী উলামায়ে কেরাম -ই হলেন দ্বীনের দায়ী, আল্লাহর পথের আহ্বানকারী এবং নিজ কওমকে ভয়প্রদর্শনকারী। তারাই হিকমত ও প্রজ্ঞার আলোকে ঈমানহারা ও ধর্মচ্যুত মানুষকে ইসলামের পথে আহ্বান করবে।

সুতরাং নবী-রাসূলের অবর্তমানে উলামায়ে কেরাম যেমন দ্বীনি ইলমের ধারক-বাহক, কুরআন-হাদীসের সংরক্ষক, তেমনি ইসলামের প্রচার-প্রসার, জাতির নিকট ধর্মের বাণী ও সত্য পয়গামের পৌছানোর দায়িত্ববান দ্বীনের দায়ী। দ্বীনের জ্ঞান হাসিলের পর আলেমের দায়িত্ব ও কর্তব্য কি হবে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক-নির্দেশনা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে-

ولينذروا قومهم إذا رجعوا إليهم لعلهم يحذرون

অর্থ : যেন তারা স্বজাতিকে আল্লাহর নাফরমানি থেকে ভয় প্রদর্শন করে, যখন তারা তাদের নিকট প্রত্যাবর্তন করবে । যাতে তারা বাঁচতে পারে । -সূরা তাওবা: ১২২

উক্ত আয়াতে আলেমদের দায়িত্ব বলা হয়েছে, ‘انذار’ বা ভয়প্রদর্শন । এর প্রকৃত ধরন হলো- পিতা স্নেহবশে আপন ছেলেকে আগুন, বিষাক্ত প্রাণী ও অন্যান্য কষ্টদায়ক বস্তু থেকে যেভাবে ভয় প্রদর্শন করে। এর মূলে থাকে প্রগাঢ় মমতা ও স্নেহবোধ । এর কলাকৌশলও ভিন্ন। আরবীতে একে বলা হয় ‘انذار’ এজন্য নবী-রাসূলগণ ‘نذير’ উপাধীতে ভূষিত। আলেমগণের উপর জাতিকে ভয় প্রদর্শনের যে দায়িত্ব রয়েছে, তা মূলত নবীগণের মীরাস যা হাদীসমতে উলামায়ে কেরাম লাভ করেছেন।

আলোচ্য আয়াতে যদিও শুধু ভয়প্রদর্শনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, কিন্তু অন্য দলীলের দ্বারা একথাও বুঝা যায় যে, আলেমগণের অন্যতম দায়িত্ব হলো নেককার বান্দাদেরকে সুসংবাদ দেয়া এবং আল্লাহর পথে মানুষকে আহ্বান করা । সৎ কাজের আদেশ করা ও অন্যায় কাজ থেকে বারণ করা। যেমন আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-

كنتم خير أمة أخرجت للناس تأمرون بالمعروف وتنهون عن المنكر وتؤمنون بالله

অর্থ : তোমরাই সেই শ্রেষ্ঠ উম্মত, মানবজাতির কল্যাণের জন্য যাদের সৃষ্টি করা হয়েছে। তোমরা ভালকাজের আদেশ করবে, মন্দ কাজে নিষেধ করবে এবং আল্লাহর উপর ঈমান রাখবে। -সূরা আলে-ইমরান: ১১০

অন্য এক আয়াতে আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহর শ্রেষ্ঠত্বের কথা বর্ণনা করেছেন-

وممن خلقنا أمة يهدون بالحق وبه يعدلون

অর্থ : আমি যাদের সৃষ্টি করেছি তাদের মধ্যে এমন একটি সম্প্রদায় রয়েছে, যারা সৎপথ প্রদর্শন করে এবং তদানুযায়ী ন্যায়বিচার করে। -সূরা আরাফ : ১৮১

এতে মুসলিম উম্মাহর (যার শীর্ষ চূড়ায় রয়েছে উলামায়ে কেরাম) আত্মিক ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বিধৃত হয়েছে। তারা ব্যক্তিগত স্বার্থ ও কামনা-বাসনা বিসর্জন দিয়ে আসমানী গ্রন্থের নির্দেশ অনুযায়ী নিজেরাও চলে এবং অন্যদেরকেও চালাবার চেষ্টা করে। কোনো ব্যাপারে কলহ-বিবাদ সৃষ্টি হলে তার মীমাংসাও তারা আসমানী গ্রন্থের সাহায্যেই করে, যাতে কোনো ব্যক্তি বা সম্প্রদায়ের স্বার্থপরতার আশঙ্কা নেই ।

উলামায়ে কেরামের দায়িত্ব দ্বীনের সঠিক আকীদা-বিশ্বাসের প্রচার-প্রসার

উলামায়ে উম্মতের অন্যতম একটি দ্বীনি ফরীযা বা কর্তব্য হলো সময়ের সকল ফিতনা ও জাহেলি কর্মকাণ্ডকে বিদূরিত করা, মুসলিম সমাজে শিকড় গেড়ে বসা বিদ’আতী আচার-আচরণ ও চিত্তা বিশ্বাসকে মূলোৎপাটন করে দ্বীন ও শরীয়তের সদাজাগ্রত অতন্দ্র প্রহরী ও তত্ত্বাবধায়কের কঠিন দায়িত্ব আঞ্জাম দেওয়া । যেমন পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-

والربانيون والأحبار بما استحفظوا من كتاب الله وكانوا عليه شهداء

অর্থ : আল্লাহওয়ালা (রাব্বানী) ও ধর্মবিদগণ (আলেম-উলামা) (আল্লাহর কিতাবানুসারে ফয়সালা দিবেন) কারণ, তাদেরকে আল্লাহর কিতাবের রক্ষক করা হয়েছিল এবং তারা ছিল এর উপর সাক্ষী। -সূরা মায়েদা ৪৪

উক্ত আয়াতে ‘রাব্বানী’ দ্বারা উদ্দেশ্য আল্লাহওয়ালা, আধুনিক পরিভাষায় যাদেরকে শাইখ, মুরশিদ, পীর ইত্যাদি নামে অভিহিত করা হয়। ‘আহবার’ দ্বারা উদ্দেশ্য জ্ঞান ও শিক্ষা-দীক্ষায় পারদর্শী উলামায়ে কেরাম। মোটকথা, এখানে পীর-মুরশিদ ও উলামায়ে কেরামের মধ্যে বিভেদহীন ঐক্যের কথা যেমন বিধৃত হয়েছে, তেমনি তাদের উপর খোদার পক্ষ হতে আবশ্যকীয় দায়িত্ব ও কর্তব্য আরোপিত হয়েছে যে, তারা জনগণের মাঝে আল্লাহর নির্দেংশনাবলী প্রয়োগ করবে। তারা আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য করবে, কিতাবুল্লাহ তথা আল্লাহর বিধি-বিধান সংরক্ষণ করবে।

আমাদের মহান পূর্বসূরীদের সবচেয়ে গৌরবময় কীর্তি ও অবদান এই যে, তারা সর্বশক্তি দিয়ে দ্বীনি চেতনা ও স্বকীয়তার পূর্ণ হেফাজত করেছেন। এ বিষয়ে সময়ের কোনো ফিতনার সম্মুখে আত্মসমর্পন করেননি। সমাজের কোনো বিদ’আত ও রসম-রেওয়াজের সাথে আপোষ করেননি । জাহেলিয়াতের মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা কোনো চিন্তাধারার প্রতি বিন্দুমাত্র শিথিলতা প্রদর্শন করেননি।

উলামায়ে কেরামের দায়িত্বই সর্বাগ্রে নতুন ফিতনার মোকাবিলায়

খোদায়ী ফয়সালা আমাদের জন্য যে যুগ ও সময় নির্বাচন করেছে তার দায়-দায়িত্ব বিগত সময়ের তুলনায় অনেক বেশী। কারণ পৃথিবীতে বড় বড় ফিতনা আজ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। নতুন মতাদর্শ, নতুন লা-দ্বীনি চিন্তাধারার তুফান-সয়লাব শুরু হয়েছে। জড়বাদ, নাস্তিক্যবাদ, জাতীয়তাবাদ, এ ধরনের আরো বহু বাদ-মতবাদ আজ নবুয়তে মুহাম্মদীর সামনে হুমকী হয়ে দাঁড়িয়েছে । জাহেলিয়াত নতুন নতুন রূপে আত্মপ্রকাশ করছে। ধর্মদ্রোহী, ইসলাম-বিদ্বেষী, দেশ ও জাতির শত্রুরা নানাভাবে নতুন নতুন শিরক-কুফর ছড়িয়ে দিতে সর্বাত্মক শক্তি ও ক্ষমতা প্রয়োগ করছে। বাতিলের এমন প্রলয়-তুফানের সামনে ইস্পাত কঠিন প্রতিজ্ঞা, সাহসিকতা ও আন্তরিকতা নিয়ে উলামায়ে কেরামকেই সর্বাগ্রে রুখে দাড়াতে হবে।

দাওয়াতের মাধ্যমে, হিকমত ও প্রজ্ঞার আলোকে ধৈর্যের পাহাড় নিয়ে সম্মুখপানে এগোতে হবে। নাস্তিক্যবাদের মূলে কুঠারাঘাত করতে হবে ঈমানী চেতনা জাগিয়ে দিয়ে। আমাদের গৌরবময় ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক দারুল উলূম দেওবন্দের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল প্রবল দ্বীনি চেতনা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং ঈমান ও ইসলামের হেফাজতের অপরিসীম উদ্দীপনা ও প্রেরণা নিয়ে। অনুরূপভাবে হিন্দুস্থানের ভূমিকে ইসলামের চিরশত্রু পশ্চিমা হানাদার ইংরেজদের কবল থেকে মুক্ত করার উদ্দেশ্যে এবং পাশ্চাত্য শিক্ষা ও সভ্যতার আগ্রাসনের মোকাবিলার দীপ্ত মানসে। আমাদের পূর্বপুরুষ-আকাবিরে দেওবন্দ-যাদের অপরিসীম ত্যাগ ও কুরবানীর উছিলায় এই উপমহাদেশের মানুষ ইসলামের মহানেয়ামত এবং ইলমের দৌলত লাভ করেছে, যারা শত ঝড় তুফানের মুখেও দ্বীনের মশালকে সমুন্নত রেখেছেন এবং বাতিলের মোকাবিলায় ইসলামের দূর্গ রক্ষা করেছেন, এই যুগের উলামায়ে কেরাম তো তাদেরই পবিত্র রক্তের উত্তরাধিকারী।

সুতরাং এ যুগের উলামায়ে কেরামকেও সেই দ্বীনি প্রেরণা ও ধর্মীয় চেতনার বাহক হতে হবে এবং তাদের মৌলিক বৈশিষ্ট্যে পরিচিত হতে হবে। তাদের আদর্শ ও পস্থার অনুসারী হয়ে সকল বাতিল অপশক্তির মোকাবিলা করতে হবে এবং দৃপ্ত সাহসে সব নতুন ফিতনার প্রতিরোধ করতে হবে। এটাই সময়ের দাবি ও যুগের চাহিদা এবং উলামায়ে কেরাম এর গুরুদায়িত্ব ও কর্তব্য। আল্লাহ্ তায়ালা আমাদের সবাইকে কবুল করুন, আমীন ।

================================================================================

কুরআনুল কারিমের কথা প্রবন্ধটি পড়তে ক্লিক করুন
আরো জানতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েব সাইট রাহে সুন্নাত ব্লগ

Leave a Reply

Your email address will not be published.