ওলামায়ে কেরামের বিদায়

ওলামায়ে কেরামের বিদায় Farewell to the scholars Kazi Mojahidul Islam r.

আকাবির-আসলাফ জীবন কথা জীবনের গল্প মনীষী চরিত

ওলামায়ে কেরামের বিদায়

মাওলানা ওয়াহিদুদ্দীন খান

কাজী মুজাহিদুল ইসলাম কাসেমী একজন মুসলিম কাণ্ডারী এবং নির্ভরযোগ্য আলেমেদীন ছিলেন। তিনি ৯ অক্টোবর ১৯৩৬ সালে দারভাঙ্গা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন। ৪ এপ্রিল ২০০২ সালে দিল্লিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন দীনের এই মুজাহিদ। (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজেউন)। হযরত কাযী মুজাহিদুল ইসলাম কাসেমী রহ. এর মৃত্যু শেষ যুগের জন্য বেদনাদায়ক একটি অধ্যায়। যাকে হাদীসের ভাষায় ‘জিহাবুল ওলামা’ বলা হয়। অর্থাৎ আলেমদের চলে যাওয়া বা ওলামায়ে কেরামের উঠে যাওয়া। সাধারণভাবে এর মর্মার্থ হচ্ছে, ওলামায়ে কেরাম এক এক করে চলে যাবে এবং কোন আলেম দুনিয়াতে অবশিষ্ট থাকবে না। এখানে ওলামা দ্বারা উদ্দেশ্য মুজতাহিদ ওলামায়ে কেরাম।

এই হাদীসে ওলামা দ্বারা বুঝানো হয়েছে ওই সব আলেমদের যারা উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিত্বের অধিকারী। পরহেজগারীর দিক থেকে উচ্চ আলেমদের বুঝানো হয়নি। জাতির খেদমতে যেসব আলেম উঁচু দরজায় পৌঁছেছে। হাদীসের আরো একটি ব্যাখ্যা হলো, আলেম হওয়ার যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিগণ আলেম হওয়া থেকে বিরত থাকবে। এটা ব্যক্তিবিশেষের বিদায় নয় বরং যুগের বিদায়।

এক সময় আধুনিক প্রযুক্তি মানুষের সামনে বেশি বেশি প্রকাশ পেতে থাকবে। প্রযুক্তির উন্নয়নের সুযোগ এবং বস্তুবাদের প্রকাশ এতই বৃদ্ধি পাবে যার ফলে মানুষ ধীরে ধীরে দুনিয়ামুখী হয়ে যাবে। সৎ চরিত্রের লোক দুনিয়া থেকে পালিয়ে যাবে।

‘জাহেলী যুগে যে উত্তম ছিল ইসলামের যুগেও সে উত্তম।’ এই নীতির ভিত্তিতে উচ্চ গুণাবলীর মানুষই শ্রেষ্ঠ আলেম হয়ে থাকে। যখন উত্তম জেহেন দীনের প্রতি আসক্ত না হয় তখন দীন উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ওলামা থেকে শূন্য হয়ে যায়। এরপর ওই সমস্ত লোক যারা দীনী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখে, তারা নিজেকে অযোগ্যতার ওপরও পার্থিব বস্তুর সঙ্গে নিজের অবস্থান শক্ত করে নেয়।

মাওলানা মুজাহিদুল ইসলাম কাসেমী রহ. অসাধারণ গুণাবলীর অধিকারী ছিলেন। তিনি বক্তৃতা, রচনা, ধীশক্তি এবং দূরদর্শিতার ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ এক ব্যক্তি ছিলেন। তিনি যদি নিজ দক্ষতায় স্যেকুলার ডিগ্রী ও স্যেকুলার মতাদর্শ গ্রহণ করতেন তবে দুনিয়ার বৃহৎ ফায়দা অর্জন করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তাঁর উত্তম গুণাবলীকে ইসলাম এবং মুসলিম উম্মাহর খেদমতে নিয়োজিত করেছেন। নিজেকে দীনের জন্য ওয়াকফ করে দিয়েছেন পুরোপুরিভাবে। তিনি এমনই এক আলেম ছিলেন যিনি পার্থিব অর্জনকে নিজের উদ্দেশ্য বানাননি। তিনি নিজের প্রবৃত্তিকে বস্তুবাদী স্বার্থ থেকে দীনী স্বার্থের দিকে ধাবিত করেছিলেন।

তিনি এতটাই উত্তম দিলের অধিকারী ছিলেন যে, নিজের গুণাবলী প্রখর হওয়া সত্ত্বেও বস্তুগত স্বার্থের দিকে প্রত্যাবর্তন করেননি বরং এই প্রখর মেধাকে দীনের জন্য ওয়াকফ করে দিয়েছেন। তিনি বিভিন্ন স্থানে অগণিত জাতীয় প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছেন । রাজ্যের ভেতর ও বাহিরেও তাঁকে উচ্চ পদ দেয়া হয়েছে। মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ. (মৃত্যু ১৯৪৩) কে এক ব্যক্তি প্রশ্ন করলেন, আপনার প্রতিষ্ঠান হতে আজকাল ধীশক্তিসম্পন্ন আলেম তৈরি হয় না। তিনি জবাব দিলেন আসল কথা এটা নয় বরং সঠিক কথা হল উত্তম ধীশক্তিসম্পন্ন লোক এখন দীনী প্রতিষ্ঠানগুলোতে আসে না। এটিই আলেমদের বিদায় এর একটি উদ্দেশ্য।

যাকে মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ. তাঁর সহজসুলভ ভঙ্গিতে বর্ণনা করেছেন এটিই নতুন অবস্থা যা ভবিষ্যতে সৃষ্টি হবে। এর কারণ হলো, নতুন শিল্প বিপ্লবে যে পদ্ধতি সৃষ্টি করা হয়েছে এর মধ্যে উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন লোকদের এমন অবস্থানে দেখা যায় যাদের আর কখনো নযরে আসেনি।

আগেকার যুগে লেনদেন নির্ভরশীল ছিল চাষাবাদ ও মৌখিক চুক্তির ওপর। এই তরিকায় অর্জনটা এক অবস্থানে সীমাবদ্ধ থাকত। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তি এই অর্জনের সুযোগ লক্ষগুণে বৃদ্ধি করেছে। এখন এই পদ্ধতিতে এতটাই সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে যে ইতোপূর্বে তা কখনো লক্ষ করা যায়নি। বস্তুগত সুবিধা অর্জনের সুযোগ এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে, উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গকে দীনী শিক্ষা থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছিল, যেখানে ওলামায়ে কেরামের জন্ম হয়। তারা জাগতিক শিক্ষা অর্জনের দিকে ঝুকে যাচ্ছিল দীনী তালীম অর্জনকারী ছাত্রদের মধ্যে দুর্বলতা দেখে।

এই কঠিন অবস্থার মধ্যেও কাজী মুজাহিদুল ইসলাম কাসেমী রহ. বিচলিত হননি। তিনি ছিলেন অটল। দীনের প্রকৃত মুজাহিদ। সেই যামানার সবচেয়ে বড় জিহাদ এই ছিল যে, তিনি দুনিয়ার চাকচিক্যের মোকাবেলায় নিজেকে দীনের জন্য সমর্পণ করে দিয়েছেন। এই কুরবানীটা ছিল ওই প্রকারের যা কোন ব্যক্তিকে সম্মানিত মুজাহিদ বানিয়ে দেয়। মাওলানা কাসেমী রহ. নিঃসন্দেহে শক্ত মুজাহিদে ইসলাম ছিলেন।

হযরত মাওলানা মুজাহিদুল ইসলাম কাসেমী রহ.-এর বিভিন্ন গুণাবলী থেকে এও একটি গুণ ছিল যে, তিনি নিজে পবিত্র ও উত্তম মনের মানুষ হওয়ায় সকলের কাছে প্রিয়পাত্র ছিলেন। মুসলমানদের প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানের খোঁজখবর নিতেন অত্যন্ত দরদের সঙ্গে।

তিনি সর্বমতে গ্রহণীয় একজন আলেম হওয়ার একটি প্রসিদ্ধ রাস্তা অবলম্বন করে চলতেন। আল্লাহর কাছে অশেষ প্রার্থনা, নতুন বর্ষ হতে যেন এমন লোক সৃষ্টি হন যারা তাঁর রাস্তার অগ্রভাগে থাকবে। পৃথিবীতে যেন এমন লোক সৃষ্টি হয় যারা এক সঙ্গে ইলমী যোগ্যতায় পরিপূর্ণ এবং সর্বজন স্বীকৃত বলে গণ্য হবে। মাওলানা মরহুমের জিন্দেগী নতুন প্রজন্মকে এই খবর দেয় যে, আমার মৃত্যুকে মাতমের বস্তু বানিও না; বরং এটিকে সম্মানিত নৌকা বানাও যাতে আরোহণ করে জাতির খেদমতে লেগে যাও। আমি যেখানে ছেড়ে এসেছি সেখান থেকে তোমরা অগ্রসর হও। জাতিকে পুনর্গঠিত করার ধারা জারী রাখ এই পর্যন্ত যে, তুমি এর শেষ মঞ্জিল পর্যন্ত পৌছতে পার।’

ভাষান্তর : আবু তাসনীম উমাইর

আরো জানতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েব সাইট রাহে সুন্নাত ব্লগ

মুজাহিদ! তুমি বিনে ইলমের আসর নীরব | মাওলানা মুহাম্মদ সালেম কাসেমী
নতুন প্রজন্মের নতুন অভিভাবক। কাজী মুজাহিদুল ইসলাম কাসেমী রহ.

Leave a Reply

Your email address will not be published.