করোনা ভাইরাস অমূলক ভীতি ও অস্থিরতার নাম সতর্কতা নয় বরং তা বাড়াবাড়ি : সতর্কতা কাম্য বাড়াবাড়ি পরিত্যাজ্য মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক || রাহে সুন্নাত ব্লগ

Blog (ব্লগ) বিবিধ সংবাদ

প্রসঙ্গ : করোনা ভাইরাস

অমূলক ভীতি ও অস্থিরতার নাম সতর্কতা নয় বরং তা বাড়াবাড়ি : সতর্কতা কাম্য বাড়াবাড়ি পরিত্যাজ্য

الحمد لله وسلام على عباده الذين اصطفى، أما بعد :
কোনো ভূমিকা ছাড়াই বিষয়টি নিয়ে কিছু জরুরি নিবেদন পেশ করার চেষ্টা করছি।  আল্লাহ্ই তাওফীকদাতা।
প্রথম নিবেদন
সর্বপ্রথম যে বিষয়টি মুসলমানদের মন-মানসে দৃঢ়ভাবে গেঁথে নেয়া উচিত তা হল- আল্লাহ তাআলা হক আকীদা ও ইসলামী শরীয়তের মাধ্যমে আমাদেরকে স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্য দান করেছেন। অন্যান্য জাতি-গোষ্ঠীর কাছে আছে শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞান আর আমাদের মুসলমানদের কাছে চিকিৎসাবিজ্ঞান ছাড়াও আল্লাহ প্রদত্ত আরো দুটি তোহফা রয়েছে; ঈমানী আকীদা ও ইসলামী শরীয়ত। সুতরাং মুসলিমগণ মহামারি বা অন্য কোনো ব্যাধির প্রতিকারে বিজ্ঞানের নামে প্রচারিত সব ধরনের কথা এবং যে কোনো ধরনের কর্মপদ্ধতি ঢালাওভাবে গ্রহণ করতে পারে না; বরং এক্ষেত্রে সে তার ইসলামী আকীদা ও শরীয়তকেও সামনে রাখবে।
দ্বিতীয় নিবেদন
ইসলামপূর্ব জাহেলিয়াতের মত নব্য জাহেলিয়াতে আক্রান্ত অনেক মানুষের মাঝেও এ ধ্যান-ধারণা রয়েছে যে, কিছু রোগ এমন রয়েছে, যা নিজ শক্তিবলেই সংক্রমিত হতে পারে। যেন আল্লাহ তাআলার কুদরত ও তাকদীরের বাইরে এ রোগ নিজেই কাউকে আক্রান্ত করার শক্তি রাখে। কোনো সন্দেহ নেই, এটা কুফরি ও শিরকী আকীদা, ঈমান ও তাওহীদ পরিপন্থী আকীদা।
 রোগ-ব্যাধি সব আল্লাহ তাআলারই সৃষ্টি। ওষুধও সৃষ্টি করেছেন তিনি। শিফাও তাঁর হাতে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
مَا أَنْزَلَ اللهُ دَاءً، إِلّا قَدْ أَنْزَلَ لَهُ شِفَاءً، عَلِمَهُ مَنْ عَلِمَهُ، وَجَهِلَهُ مَنْ جَهِلَهُ.
আল্লাহ যে রোগই সৃষ্টি করেছেন তার জন্য শিফারও ব্যবস্থা রেখেছেন। কেউ তা জানতে পেরেছে। আর কেউ জানতে পারেনি। -মুসনাদে আহমদ, হাদীস ৩৫৭৮
إِنّ اللهَ حَيْثُ خَلَقَ الدّاءَ، خَلَقَ الدّوَاءَ، فَتَدَاوَوْا.
 আল্লাহ যেমন রোগ সৃষ্টি করেছেন ওষুধও সৃষ্টি করেছেন। তাই তোমরা চিকিৎসা গ্রহণ করো। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১২৫৯৬
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন-
لِكُلِّ دَاءٍ دَوَاءٌ، فَإِذَا أُصِيبَ دَوَاءُ الدّاءِ بَرَأَ بِإِذْنِ اللهِ عَزّ وَجَلّ.
প্রত্যেক রোগেরই ঔষধ রয়েছে। তাই মানুষ যদি রোগের (সঠিক) ঔষধ পেয়ে যায় আল্লাহ তাআলার হুকুমে আরোগ্য লাভ হয়। _সহীহ মুসলিম, হাদীস ২২০৪
খালিক ও মালিক তো শুধু আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। কোনো কিছুই তাঁর কুদরত ও তাকদীরের বাইরে নয়। জীবন-মরণ, কল্যাণ-অকল্যাণ, লাভ-ক্ষতি, উপকার-অপকার সব কিছু তাঁরই হাতে-
لَهُ الْخَلْقُ وَالْأَمْرُ.
সৃষ্টি তাঁর, হুকুমও তাঁরই। সুতরাং রোগ-ব্যাধি নিজ শক্তিবলে সংক্রমিত হওয়ার ক্ষমতা রাখে- এজাতীয় শিরকী আকীদা-বিশ^াসের ইসলামে কোনো স্থান নেই।
তবে এটি একটি বাস্তবতা যে, কিছু রোগ-ব্যাধি এমন আছে, তাতে আক্রান্ত ব্যক্তির সংশ্রব আল্লাহ্র হুকুমে কখনো কখনো অন্যের জন্য আক্রান্ত হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এরকম বাহ্যিক কারণপ্রসূত সংক্রমণ, যা আল্লাহ্র হুকুমে হয়ে থাকে- পূর্ববর্ণিত আকীদায়ে তাওহীদের পরিপন্থী নয়; বরং আল্লাহ্র সৃষ্ট অন্যান্য বাহ্যিক কারণের মত এটাকেও ইসলামী শরীয়ত একটি কারণ হিসেবে স্বীকার করে এবং এর ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশনা দেয়। সঙ্গে সঙ্গে এ বিষয়ে জোর তাকিদ করে যে, এক্ষেত্রে কোনো অমূলক ধারণা ও ওয়াসওয়াসার পিছে পড়া যাবে না। ইসলামে সতর্কতা কাম্য, কিন্তু অমূলক ধারণা ও ওয়াসওয়াসার অনুগামী হওয়া নিষেধ।
করোনা-মহামারিটি যদিও নতুন, কিন্তু মহামারি তো নতুন কিছু নয়। তাছাড়া আল্লাহ তাআলার হুকুমে নতুন নতুন রোগও মহামারির রূপ ধারণ করতে পারে। মহামারি ও অন্যান্য বিপদ-আপদ-দুর্যোগ বিষয়ে কুরআন সুন্নাহ্য় যে হেদায়েত ও বিধি-বিধান বিদ্যমান, পূর্বসূরী মনীষীগণ নিজ নিজ যুগে সেগুলোর  উপর যেভাবে আমল করেছেন- কুরআন-সুন্নাহ্র সে হেদায়েত এবং সালাফের সে কর্মপন্থা আজো সংরক্ষিত আছে, কিয়ামত পর্যন্ত সংরক্ষিত থাকবে এবং সর্বদা নতুন নতুন সব মহামারি-মুসীবতেও পথনির্দেশ করতে থাকবে।
তৃতীয় নিবেদন
যে ভয় ও শংকা মানুষকে হতাশ ও হতোদ্যম করে দেয় তা নিষিদ্ধ। মানুষ ভয় ও শংকায় থাকবে তো কবরের যিন্দেগীর ব্যাপারে, হাশরের ভয়াবহ অবস্থার ব্যাপারে। হিসাব-নিকাশের জন্য আল্লাহ তাআলার সামনে দণ্ডায়মান হওয়ার কথা চিন্তা করে। অথচ এখানেই ইসলাম ভারসাম্য রক্ষার হুকুম দিয়েছে। ভয়ের সাথে আশা রাখার তাকীদ দিয়েছে এবং আশার সাথে ভয় রাখার তাকীদ করেছে। যেন ভয়ের নামে নিরাশায় নিপতিত না হয় বা আশার নামে আত্মপ্রবঞ্চনার স্বীকার না হয়।
তো যেহেতু আখেরাতের ভয়ের ব্যাপারেই ইসলামে ভারসাম্য রক্ষা করা কাম্য তাহলে অন্যান্য বিষয়ের ভয়, যা শুধু স্বভাবজাত বিষয় মাত্র, সেক্ষেত্রে সামীলংঘন কীভাবে বৈধ হতে পারে?
ইসলামে আল্লাহর উপর ভরসার এত গুরুত্ব এজন্যই যে, যাতে মুসলমানের উপর অন্য কোনো কিছুর ভয় এত প্রবল হতে না পারে, যা তাকে নিরাশ করে ফেলে  বা নিজ দায়িত্ব ও কর্মে উদাসীন করে দেয়।
ইসলামে অমূলক ধারণা ও ওয়াসওয়াসার পিছে পড়া নিষিদ্ধ হওয়ার একটা হেকমত এটাও যে, তা মানুষকে অযথা আতঙ্কগ্রস্ত করে ফেলে। যার প্রতি ভ্রূক্ষেপ না করাই মুমিন বান্দার শান।
চতুর্থ নিবেদন
ইসলামী শরীয়তে সতর্কতার বিধান রয়েছে; কিন্তু অমূলক ভীতি ও শঙ্কায় নিপতিত হওয়া নিষেধ। এজন্য সতর্কতামূলক বৈধ উপায়-উপকরণ তো অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে, কিন্তু নিছক ধারণা ও অমূলক ভীতির স্বীকার হয়ে দ্বীনী বা জাগতিক কোনো দায়-দায়িত্ব থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া যায় না।
যেমন, পাঁচ ওয়াক্ত ফরয নামায জামাতের সাথে মসজিদে আদায় হওয়া ওয়াজিব। জুমার নামায জামাতের সাথে আদায় করা ফরয। উভয়টি ইসলামের অনেক গুরুত্বপূর্ণ শিআর (পরিচয়-চিহ্ন)। কিছু কিছু বাস্তব ওযরের কারণে জুমা ও জামাতে শরীক না হওয়ার অবকাশ তো শরীয়তে আছে; সে ছাড় অবশ্যই গ্রহণ করা দরকার। কিন্তু অমূলক ধারণা প্রসূত শংকা ও ভীতির কারণে জুমা ও জামাতের উপর পাবন্দি লাগানো বা মসজিদ বন্ধ করার চিন্তা করাÑ এর কোনো অবকাশ নেই।
ধরে নিলাম, এ ভাইরাসটি এমন যে, আক্রান্ত ব্যক্তির সংশ্রব অন্য ব্যক্তির আক্রান্ত হওয়ার একটি কারণ। গোড়াতেই তো এটি একটি সম্ভাবনা মাত্র অর্থাৎ আক্রান্ত হতেও পারে, নাও পারে। তথাপিও এ সম্ভাবনাকে আমলে নিয়ে, যার মোটামুটিভাবে একটা ভিত্তি আছে, সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা নিষিদ্ধ নয়; বরং একটা পর্যায় পর্যন্ত কাম্যও বটে। এ কারণে এ ধরনের রোগে যিনি আক্রান্ত হয়ে গেছেন বা আক্রান্ত হওয়ার প্রবল আশংকা রয়েছে তার ব্যাপারে শরীয়তের বিধান হল, সে নিজেও সতর্কতা অবলম্বন করবে এবং অন্যরাও তার ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করবে। তার সেবা-শুশ্রƒষার দায়িত্ব সতর্কতার সাথেই আদায় করতে হবে। কিন্তু প্রশ্ন তো আসে তখন যখন সম্ভাবনার সীমানা পার হয়ে দলীল-প্রমাণবিহীন ধারণার ভিত্তিতে সতর্কতার নামে বাড়াবাড়ি শুরু হয়ে যায়।  নতুবা সাবধানতা ও সতর্কতা যতটুকু সম্ভবÑ গ্রহণ করা কাম্য ।
এটা তো সবারই জানা যে, নামাযের  জন্য যাওয়ার সময়ই ওযু অবস্থায় থাকা ভালো, অর্থাৎ নামাযের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার আগেই ওযু-তহারাত সেরে নেওয়া এমনিতেই মুস্তাহাব আর এই মুস্তাহাবকে আমলে আনার এটাই উপযুক্ত সময়।  আর এটাও সবাই জানে যে, ফরয নামাযের আগে-পরে যে সুন্নত-নফল নামায রয়েছে সেগুলোতে জামাতের বিধান নেই। একা পড়ার নামায এগুলো। স্বাভাবিক অবস্থায়ও ঘরে পড়লে সমস্যা নেই। একারণে এ বিশেষ পরিস্থিতিতে সুন্নত ও নফল নামায ঘরে পড়ার মাশওয়ারা দেয়া হয়েছে। এমনিভাবে লম্বা দুআ-অযিফা ও যিকির-আযকার, যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আমলÑ নিজ নিজ ঘরে বসেও আদায় করা যায়। এগুলো মসজিদেই আদায় করতে হবে- এমন কোনো মাসআলা নেই। তাছাড়া বিশেষ পরিস্থিতিতে নামায সংক্ষেপ করারও অবকাশ আছে; মাসনূন কেরাতের সবচেয়ে কম পরিমাণের উপর আমল করার সময়ই এখন। বলার উদ্দেশ্য হল, শরীয়ত যেসব বিষয়ে রুখসত (ছাড়) দিয়ে রেখেছে তা গ্রহণ করাতে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু যেসকল বিষয় ইসলামের শিআর-এর অন্তর্ভুক্ত সেগুলোতে সতর্কতার নামে অমূলক ধারণার ভিত্তিতে বিধি-নিষেধ আরোপ করা বা নিরুৎসাহিত করার সুযোগ নেই। যেমন, সালাম ইসলামের শিআর (পরিচয়-চিহ্ন)। কোনো মুসলিম ভাইয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে সালাম দেওয়া সুন্নতে মুআক্কাদাহ। সালামের উত্তর দেওয়া ওয়াজিব। কেউ যদি সংক্রমণের ভয়ে সালাম থেকে বিরত থাকে তাহলে তা হবে অন্যায়। পক্ষান্তরে মুসাফাহা হল একটি ঐচ্ছিক মুস্তাহাব আমল। তাই এ ধরনের বিশেষ অবস্থায় মুসাফাহা থেকে বিরত থাকতে কোনো সমস্যা নেই। তবে মুসাফাহা থেকে বিরত থাকলে এমন নিয়ত করবে না যে, আমি তার কারণে আক্রান্ত হতে পারি; বরং এ নিয়ত করবে যে, আমি যেন তার ক্ষতি বা বিরক্তির কারণ না হই।
উল্লেখ্য, আক্রান্ত বা আক্রান্ত হওয়ার বিশেষ লক্ষণধারী ব্যক্তিরা নামাযের জামাতে যাবেন না। তেমনি বৃদ্ধব্যক্তি, যার রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম, বিশেষত যারা আগে থেকেই জটিল রোগে আক্রান্ত, তাদের জন্য এ ধরনের ক্ষেত্রে মসজিদের জামাতে না যাওয়ার সুযোগ আছে। আর যাদের বাহ্যিক কোনো ওযর নেই এবং যাওয়ার হিম্মতও আছে তারাও সতর্কতা ও সাবধানতার যাবতীয় ব্যবস্থা অবশ্যই গ্রহণ  করবেন।
বাড়াবাড়ির আরো কিছু নমুনা
১. নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি এক ব্যক্তি পশ্চিমের কোনো দেশ থেকে দেশে ফিরেছেন। এয়ারপোর্টগুলোতে জায়গায় জায়গায় তার পরীক্ষা নিরীক্ষা হয়েছে। সকল পরীক্ষায় এটাই প্রমাণিত হয়েছে যে, তার মধ্যে ভাইরাস নেই। এভাবে তিনি ঢাকায় পৌঁছেন।
উন্নত রাষ্ট্রগুলো থেকে ভাইরাসমুক্ত হওয়ার সনদ ধারণ করা সত্তে¡ও তার ভাইয়েরা তাকে ঘরে জায়গা দেয়নি।
অবশেষে তাকে কোনো হোটেলে তোলা হয়েছে। হোটেলে উঠতে না উঠতেই হোটেল কর্তৃপক্ষ কীভাবে যেন জানতে পেরেছে যে, এ লোক বিদেশ থেকে এসেছে। ব্যস, তারা পুলিশকে খবর দিয়ে দেয়। পরিস্থিতি টের পেয়ে এ ব্যাক্তি কোনোমতে সেখান থেকে কেটে পড়তে সক্ষম হয়।
এবার বলুন, এটাকে ওয়াসওয়াসা-প্রবণতা না বলা হলে আর কী বলা হবে!!
আরো জানা গেছে যে, এই রোগে আক্রান্ত কোনো মায়্যেতকে সতর্কতা অবলম্বন করে এক কবরস্থানে দাফন করতে নেয়া হলে এলাকার লোকেরা বাধা দিয়েছে। ফলে লাশ অন্য কোথাও নিতে হয়েছে। এটা অপ্রয়োজনীয় ভয় এবং নিছক ওয়াসওয়াসা। এটা হল নিজেদের মওতের ব্যাপারে গাফলত; যেন এদেরকে মরতে হবে না!
২. আমাদের দেশে এখন ঋতু পরিবর্তন হচ্ছে। এ সময় সর্দি, কাশি, ঠাণ্ডা, জ্বর মামুলি বিষয়। ঘটনাচক্রে এগুলোই নাকি করোনা ভাইরাসের প্রাথমিক লক্ষণ। এখন সাধারণ জ্বর-ঠাণ্ডায় আক্রান্ত রোগীদের কত শতাংশের মধ্যে করোনা ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে এর তোয়াক্কা না করে কেবলমাত্র সর্দি-জ্বর দেখেই যদি ডাক্তারগণ আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং চিকিৎসা করতে প্রস্তুত না হন তাহলে বিষয়টি কেমন হবে? এমনিভাবে যেহেতু যেকোনো রোগীর ব্যাপারেই আশঙ্কা থাকে যে, তার মধ্যে হয়ত ভাইরাস আছে; এ কারণে যদি তাকে হাসপাতালে জায়গা না দেয় এবং ডাক্তাররা তার চিকিৎসা না করে তাহলে এসব সতর্কতার নামে বাড়াবাড়ি। এ থেকে বেঁচে থাকা জরুরি। হাঁ, এক্ষেত্রে সরকারেরও দায়িত্বÑ তাঁদের নিরাপত্তার প্রয়োজনীয় সামগ্রির ব্যবস্থা করা।
৩. এক মুসলিমের উপর অপর মুসলিমের একটি হক হচ্ছে, কোনো মুসলিম অসুস্থ হলে তার সেবা-শুশ্রূষা করা। আরেকটি হক হচ্ছে, তাকে সহায়হীনভাবে নিঃসঙ্গ ছেড়ে না দেওয়া।
এ ভাইরাসে যে আক্রান্ত হয়েছে- এ হক তারও প্রাপ্য। প্রয়োজনীয়  সতর্কতা অবলম্বন করত তার এ হক আদায় করাও জরুরি। ভীতি ও শংকার কারণে সংশ্লিষ্ট কেউই তার এ হক আদায় করবে না- এটা জায়েয নেই। আর যদি নিছক ধারণার ভিত্তিতে কোনো মুসলমানের এ হক নষ্ট করা হয় তাহলে তো তা আরো বড় গুনাহ।
৪. আতঙ্ক ও ভয়ের ছুতোয় নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রি মজুত করা, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা এবং এই বাহানায় মূল্যস্ফীতি ঘটানো- সবই না জায়েয। মুসলমানদের এতটা আতঙ্কিত হওয়া উচিত নয়। আখের রিযিকের মালিক তো আল্লাহ্ই। তাছাড়া এটাও তো চিন্তার বিষয় যে, আমি একাই যদি সুখে থাকতে চাই- তো সেটা কেমন সুখ হবে!?
৫. যেসকল কার্যকলাপের কারণে মানুষের মাঝে অনর্থক আতঙ্ক বৃদ্ধি পায় সেগুলোও বাড়াবাড়ি। এগুলো পরিত্যাজ্য।
৬. তাউনের (এক প্রকারের মহামারি) ব্যাপারে হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে-
إِذَا سَمِعْتُمْ بِهِ بِأَرْضٍ فَلاَ تَقْدَمُوا عَلَيْهِ، وَإِذَا وَقَعَ بِأَرْضٍ وَأَنْتُمْ بِهَا، فَلاَ تَخْرُجُوا فِرَارًا مِنْهُ.
যখন তোমরা জানতে পারবে কোনো এলাকায় তাউন বিরাজ করছে তখন তোমরা সেখানে যাবে না। আর তোমাদের অবস্থিত অঞ্চলে তাউন আপতিত হলে তোমরা সেখান থেকে পলায়নের নিয়তে বের হবে না। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৫৭৩০; সহীহ মুসলিম, হাদীস ২২১৯
এ হাদীসের ফিতরী ও স্বাভাবিক অর্থ হল, যে নির্দিষ্ট মহল্লা বা এলাকায় বাস্তবেই এ রোগ ছড়িয়ে পড়েছে ওখান থেকে কেউ যেন বের না হয় এবং বাহির থেকেও কেউ যেন ওখানে না আসে। এটা তো স্পষ্ট যে, হাদীসে ‘আরদুন’ বলতে উদ্দেশ্য হল, নির্দিষ্ট এলাকা, যা আক্রান্ত হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে কেউ কেউ এর ব্যাখ্যা যেন এভাবে করছেন যে, এখানে ‘আরদুন’ অর্থ দেশ-মহাদেশ। আবার কেউ এমন অর্থও করছেন যে, আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কায় কেউ ঘর থেকেই বের না হওয়ার কথা বলা হয়েছে- এই হাদীসে। এটা হাদীসের মর্ম নয়। বাকি চিকিৎসাবিজ্ঞানের দাবিতে এমন করতে হলে  করতে কোনো বাধা নেই; তা তো ভিন্ন প্রসঙ্গ।
৭. অযথা ভয় ও আতঙ্কের একটা প্রকাশ এটাও যে, কিছু লোক এ ধরনের রোগে মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তির গোসল, কাফন দাফন-এর ব্যাপারেও দোদুল্যমান হয়ে পড়েছে। মনে রাখতে হবে যে, মৃত ব্যক্তিকে গোসল দেয়া, কাফন পরানো এবং নিয়মমত দাফন করা ইত্যাদি বিষয়গুলো জীবিতদের উপর ফরয হক। এ ধরনের রোগে মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তির ক্ষেত্রেও এ হক বলবৎ থাকে। তার বিষয়টি ভিন্ন নয়।
তাদের গোসল দেয়া ও কাফন-দাফনের ক্ষেত্রে যদি বাস্তবেই অন্যদের আক্রান্ত হওয়ার আশংকা থাকে তাহলে সেক্ষেত্রে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের তো উপায় আছে। এ ধরনের রোগীর চিকিৎসার ক্ষেত্রে চিকিৎসক ও নার্সরা যে ধরনের সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেন তা গ্রহণ করে গোসল ও কাফন-দাফনের কাজ করতে তো কোনো অসুবিধা নেই।
আল্লাহ না করুন, মুসলিম অধ্যুষিত কোনো এলাকায় যদি মৃতের সংখ্যা বেড়ে যায় সেক্ষেত্রে সরকারি ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় সতর্কতাসহ মৃতের গোসলের জন্য প্রয়োজন-সংখ্যক আলাদা গোসলখানা স্থাপন করা যেতে পারে।
তবুও যেন কোনো মৃত ব্যক্তিকে গোসল-কাফন ও জানাযা ছাড়া দাফন করা না হয়। মৃত ব্যক্তির হক নষ্ট করে আমাদের জীবিত থাকার কী অধিকার আছে? মানুষ জীবিত হোক বা মৃত আল্লাহ্র কাছে সম্মানিত। ভাইরাসের কারণে এ সম্মান খতম হয়ে যায় না। জীবিত মানুষের মধ্যে ভয়-আতঙ্ক এত প্রবল না হওয়া চাই যে, সে এই মানবিক মর্যাদার মূল্যায়ন করতেও অক্ষম হয়ে পড়ে।
স্বাভাবিক অবস্থাতেও মাসনূন তরীকায় মাইয়েতকে গোসল দেওয়ার ক্ষেত্রে এ বিষয়টি বিবেচ্য যে, গোসল যেন সতর্কতার সাথে দেওয়া হয়, যাতে গোসলের পানির ছিটা থেকে বাঁচা সম্ভব হয়। এটাও আদব যে, মাইয়েতের গোসলের পানি যেন যত্রতত্র প্রবাহিত করা না হয়। বিজ্ঞানের উৎকর্ষের এ যুগে এ সুন্নত ও আদবের উপর আমল করা কোনো মুশকিল বিষয় নয়। এজন্য সতর্কতামূলক ব্যবস্থা যত প্রয়োজন অবশ্যই গ্রহণ করুন। তবে মৃত ব্যক্তির গোসল ও কাফন-দাফনের ফরয আদায়ে যেন কোনো শিথিলতা না হয়। অবশ্য একান্ত ঠেকা হলে এ ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত প্রয়োজনে গোসলের পরিবর্তে তায়াম্মুমের অবকাশের কথাও বলেছেন কোনো কোনো আলেমেদ্বীন। 
শেষ নিবেদন
এ মহামারি থেকে মানবজাতীর শেখার মতো বিষয় তো অনেক। এ সংক্ষিপ্ত পরিসরে সবগুলোর আলোচনা করাও মুশকিল। তবে একটি বিষয় না বললেই নয়। তা হল, বনী আদম তথা মানব জাতির উচিত, এ থেকে নিজেদের দুর্বলতা, অক্ষমতা ও অসহায়ত্বের উপলব্ধি লাভ করা- আল্লাহ তাআলার কুদরতের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নমুনার সামনে দুনিয়ার বড় বড় পরাশক্তিগুলো কতটা অক্ষম, কতটা অসহায়!!
কেউ যদি ঠাণ্ডা মাথায় বিষয়গুলো নিয়ে একটু ভাবে তো নিজ অক্ষমতা, অসহায়ত্ব উপলব্ধি করে সে তার সব ধরনের অহমিকা-অহংকার ও গরিমার চিকিৎসা করতে পারে। কিন্তু বড়ই আফসোস হয়Ñ যখন বিপরীত দৃশ্য সামনে আসে। এ ঘটনা থেকে বিনয়ের শিক্ষা নেয়ার পরবির্তে উল্টো কিছু লোকের যবান থেকে এমন এমন কথা বের হয়, যা থেকে অহংকার টপকে পড়ে। এ ধরনের দাবি আল্লাহ তাআলার পছন্দ নয়। এসব দাবির পরিবর্তে আল্লাহ তাআলার কাছে সাহায্য চাওয়া উচিত। আল্লাহ্র দেয়া উপায়-উপকরণের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে বৈধ ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। এ রোগ থেকে বাঁচার জন্য সতর্কতামূলক ব্যবস্থাও গ্রহণ করা উচিত। আক্রান্ত হয়ে গেলে আল্লাহ্র উপর ভরসা করে এর চিকিৎসা করানো উচিত এবং সর্বাবস্থায় তওবা-ইসতিগফার ও যিকির-দুআর বিষয়ে যত্নবান হওয়া উচিত। তো বিষয়টি হচ্ছে সতর্কতা অবলম্বন এবং চিকিৎসা গ্রহণের, শত্রুতা এবং যুদ্ধের নয়!
আল্লাহ তাআলা পৃথিবীকে সব ধরনের মহামারি ও বিশৃঙ্খলা থেকে হেফাজত করুন। বিশেষ করে উম্মতে মুসলিমাকে সকল অকল্যাণ ও পেরেশানী থেকে নিরাপদ রাখুন। সব ধরনের বালা-মসিবত ও মহামারী থেকে আপন হেফাযতে রাখুন। উম্মতের মযলুমানকে যুলুম থেকে নাজাত দান করুন- আমীন, ইয়া রাব্বাল আলামীন!
তথ‌্যসূত্র : মাসিক আল কাউসার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *