কাঙ্খিত শাহাদত || Rahe Sunnat Blog

ইসলাম প্রতিদিন ইসলামী ইতিহাস গল্প ও কবিতা শিক্ষামূলক গল্প সাহাবায়ে কেরাম

কাঙ্খিত শাহাদত

মাওলানা খ‌া‌লিদ সাইফুল্লাহ আইয়ূবী

আমীরুল মুমিনীন হজরত উমর বিন খাত্তাব রাযি. সর্বদা আল্লাহর কাছে শহীদ হবার প্রত্যাশায় দোয়া করতেন। তিনি তার শেষ হজের সময় আরাফায় দাঁড়িয়ে দীর্ঘ ভাষণ প্রদানের পর বিভিন্ন রাষ্ট্রে পাঠানো প্রতিনিধি এবং লোকদেরকে হাজির হতে নির্দেশ দেন। সবার সামনে তাদের কাছ থেকে লোকজনের কেসাস প্রদান করেন।

এই দায়িত্ব শেষ হওয়ার পর জামারায় একজন হাজির নিক্ষিপ্ত পাথরে হজরত উমরের মাথা মাথা থেকে রক্ত ঝরতে থাকে। তখন তিনি বলেন- আমাকে শীঘ্রই হত্যা করা হবে।

সায়ীদ বিন মুসাইয়িব রাযি. বলেন- উমর রাযি. মীনা থেকে মক্কার পাথরময় প্রশস্ত উপত্যকায় উট বসালেন এবং সেখানে বালু একত্র করে চাদর বিছিয়ে তাতে চিত হয়ে শুয়ে পড়লেন। এরপর আকাশের দিকে হাত উঠিয়ে দোয়া করলেন;
اللهم كبرت سني وضعفت قوتي وانتشرت رعيتي فاقبضني اليك غير مضيع ولا مفرط.
‘হে আল্লাহ! আমার বয়স বেশি হয়ে গেছে, আমার শক্তি সামর্থ্য দুর্বল হয়ে গেছে, আর আমার প্রজারা বিস্তার লাভ করেছে। এখন আমাকে ব্যর্থ এবং ত্রুটিপূর্ণ ব্যক্তিদের মধ্যে গণনা না করে আমাকে তোমার কাছে উঠিয়ে নাও।’
অতঃপর মদীনায় লোকজনের সামনে ভাষণ দিয়ে বললেন;
ايها الناس! قد السنت لكم السنن وفرضت لكم الفرائض وتركتم على الواضحة الا ان تضلوا بالناس يمينا وشمالا.
‘হে লোকসকল! সুন্নাত তোমাদের জন্য সুন্নাত হিসেবে আর ফরজ তোমাদের জন্য ফরজ হিসেবে নির্ধারিত। আর তোমাদেরকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে সুস্পষ্ট রাস্তায়। কিন্তু যদি তোমরা লোকদেরকে নিয়ে ডানে-বামে পথভ্রষ্ট খাদি গিয়ে না পড়ো।’

তিনি মদীনা ফেরার সময় শাহাদাতের প্রত্যাশা করেছিলেন। তার কন্যা হাফসা রাযি. বললেন- ‘আব্বাজান! আপনি শাহাদাতের আকাঙ্ক্ষা মদীনায় করছেন। যার শাহাদাতের আকাঙ্খা তার জন্য সীমান্তে বের হয়ে জিহাদ করা উচিত।’

হজরত উমর উত্তর দিলেন-
سالت ربي وارجو ان يلبي لي ربي ما سألت.
‘আমি আমার রবের কাছে শাহাদাতের প্রার্থনা করেছি। আর আমি যা কামনা করেছি, আশা করি আমার প্রভু তা পূর্ণ করবেন।’
উমর বিন খাত্তাব রাযি. মদীনায় পৌঁছে স্বপ্ন দেখেন এক মোরগ তাকে দুই অথবা তিনবার ঠোকর মারছে। লোকজন স্বপ্নের ব্যাখ্যায় বলল- আপনাকে এক অনারব হত্যা করবে। অতঃপর আমীরুল মুমিনীন উমর রাযি. লোকদের সমাবেশে দাঁড়িয়ে বললেন শীঘ্রই তিনি এই দুনিয়া ছেড়ে বিদায় নিচ্ছেন আর তার মৃত্যু অতি নিকটবর্তী।

এরপর একদিন তিনি মসজিদে নববীতে ফজরের নামাজে সূরা ফাতিহার পর সূরা ইউসুফ পড়া শুরু করলেন।সূরা ইউসুফ তার খুব প্রিয় ছিলো। যখন তিনি আল্লাহ তাআলার বাণী;
وابيضت عيناه من الحزن فهو كظيم.
‘এবং তার (ইয়াকুব আলাইহিস সাল্লাম) দু’চোখ দুশ্চিন্তায় সাদা হয়ে গিয়েছিলো এবং তিনি চিন্তাকে দমিয়েছিলেন।’ (সূরা ইউসুফ: ৮৪)
পর্যন্ত পৌঁছার পর নিজে কাঁদলেন এবং সকল নামাজীকে কাঁদালেন, এমনকি শেষ কাতার থেকেও কান্নার আওয়াজ শোনা গেলো। এরপর তিনি আল্লাহু আকবার বলে রুকুতে গেলেন। এমন সময় নিকৃষ্ট আবু লু’লু’ আল-মাজুসী বিষাক্ত খঞ্জর দিয়ে তার শরীরে ছয়বার আঘাত করে। মারাত্মক আহত হয়ে হজরত ওমর এই বলে নীচে পড়ে গেলেন;
حسبي الله لا اله الا هو عليه توكلت وهو رب العرش العظيم.
আশ্চর্যের বিষয় হলো, নামাজে উপস্থিত লোকেরা এই ঘটনা সম্পর্কে তখনই জানতে পারে, যখন আব্দুর রহমান বিন আউফ রাযি. অবশিষ্ট নামাজ পূর্ণ করার জন্য সামনে অগ্রসর হলেন। এই উম্মত প্রচন্ড যুদ্ধেও শত্রুর তরবার ছায়াতে নামাজ পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলেছিলো। তাই এমন প্রাণঘাতী আক্রমণের পরে তারা অবগত হতে পারেনি।

হজরত উমর রাযি. বিষাক্ত খঞ্জরের আঘাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ার পর অবশিষ্ট নামাজ পূর্ণ করার জন্য আব্দুর রহমান বিন আউফ রাযি.-কে হাত ধরে নিজের স্থানে দাঁড় করিয়ে দেন। তিনি কেরাত পড়া শুরু করলে লোকেরা অবাক হয়ে ভাবতে থাকে; আমীরুল মুমিনীনের কন্ঠে কোথায়? তার আওয়াজ কেন আসছে না? আমাদের উমরের কী হলো? উম্মতের সবচেয়ে বড় ইনসাফওয়ালার কী হলো?

হজরত উমর রাযি. মৃত্যুর যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে জিজ্ঞাসা করলেন-
من قتلني؟
‘আমাকে কে হত্যা করলো?’
উপস্থিত লোকেরা উত্তর দিলেন- আবু লু’লু’ মাজুসী।

তিনি বললেন-
الحمد لله الذي جعل قتلي على يد رجل، ما سجد لله سجدة.
‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাকে এমন ব্যক্তির হাতে হত্যা করেছেন যে কখনো আল্লাহর সামনে একটি সিজদাও করেনি।’
লক্ষণীয় বিষয় হলো, আমীরুল মুমিনীন মৃত্যু ঘনিয়ে আসা অবস্থায় বার বার জিজ্ঞেস করেন-
هل صليت؟ هل اكملت الصلاة؟
‘আমি কি নামাজ পড়েছি? আমি কি নামাজ পূর্ণ করেছি?’
তার শেষ ইচ্ছা ছিলো নামাজ পূর্ণ করে নেওয়া। যেন ফজরের নামাজ পূর্ণ করে আল্লাহর সাথে তার সাক্ষাত হয়। তিনি রাষ্ট্রের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করেননি। সন্তানদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করেননি। স্ত্রীর কথা বলেননি। উত্তরাধিকারের বিষয়ে কিছুই বলেননি। জিজ্ঞাসা করেছেন নামাজের ব্যাপারে। আর ততোক্ষণ পর্যন্ত প্রশান্তির নিঃশ্বাস ফেলেননি, যতোক্ষণ না সেই দিনের ফজরের নামাজ সূর্য উদয়ের পূর্বে আদায় করেন। এক সাহাবী বর্ণনা করেন-
لقد ظننا ان القيامة قد قامت يوم قتل عمر.
‘উমর বিন খাত্তাবের হত্যার দিন আমাদের এমন মনে হয়েছে যে, কেয়ামত সংঘটিত হয়ে গেছে।’

লোকজন তাকে ধরাধরি করে ঘরে নিয়ে যায় আর তার মাথার নীচে দেওয়ার জন্য বালিশ নিয়ে আসে। তিনি বালিশটি দূরে নিক্ষেপ করে বলেন-
ضعوا رأسي على التراب، لعل الله ان يرحمني.
‘আমার মাথা মাটিতে রেখে দাও, যেন আশা করা যায় যে আল্লাহ আমার প্রতি দয়া করবেন।’
অতঃপর তিনি কেঁদে কেঁদে বলতে থাকেন-
يامن لا يزول ملكه، ارحم من زال ملكه.
‘হে এমন সত্তা! যার রাজত্ব কখনো শেষ হয় না, সেই ব্যক্তির প্রতি দয়া করো যার রাজত্ব শেষ হয়ে গেছে।’
তিনি মুসলিম শিশুদের কাছে ডাকলেন। তারা কাঁদতে কাঁদতে তার কাছে এলো। তিন এক এক করে সকল শিশুকে চুম্বন করে তাদের মাথায় স্নেহে হাত বুলালেন। লোকজন তার সামনে দুধের পাত্র পেশ করলো। তিনি দুধ পান করার পর তা তার পেটের ক্ষতস্থান দিয়ে বাইরে গড়িয়ে পড়লো। তিনি বললেন- ‘আল্লাহর কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করি।’

যুবকদল তার খেদমতে উপস্থিত হলো। তিনি তাদের স্বাগতম জানালেন। এক যুবকের প্রতি তার দৃষ্টি পড়লো, যার কাপড় পায়ের গোড়ালির নীচে ছিলো। তাকে ডেকে বললেন- ‘ভাতিজা! তোমার পাজামা ওপরে ওঠাও।’
আমিরুল মুমিনীনের মৃত্যু ঘনিয়ে এসেছে। ক্ষতস্থানের রক্তে পুরো শরীর রঞ্জিত। তখনো তিনি ‘আমর বিল মা’রূফ ও নাহি আনিল মুনকার’ উত্তম উপদেশ এবং নিষিদ্ধ কাছ থেকে বাধা দেওয়ার দায়িত্ব পালন করে বলছেন-
ارفع إزارك، فأنه اتقى لربك وانقي لثوبك.
‘পাজামা ওপরে ওঠাও। কেননা তাতে তোমার প্রভুর জন্য তাকওয়া এবং তোমার পোশাকের পবিত্রতা রয়েছে।’
অতঃপর হজরত আলী বিন আবি তালেব রাযি. বিদায়ী কথা বলার জন্য তার কাছে এসে আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রাযি. এর বাহুতে টেক লাগিয়ে ক্রমাগত অশ্রু ঝরিয়ে বলেন-
يا ابا حفص! والله! لطالما سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول،
‘হে আবু হাফস! আল্লাহর কসম! আমি কয়েকবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি;’
جئت انا وابو بكر وعمر، و ذهبت انا وابو بكر وعمر، وخرجت انا وابو بكر وعمر.
‘আমি এসেছি আর আবু বকর উমরও এসেছে। আমি চলে গেলাম আর আবু বকর উমরও চলে গেলো। আমি বের হলাম আর আবু বকর উমরও বের হলো।’
فاسأل الله أن يحشرك مع صاحبيك.
‘আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করি, তিনি আপনাকে আপনার উভয় সাথীর সাথে মিলিত করেন।’

তার কথা শুনে হজরত উমর বললেন-
يا ليتني انجو كفافا، لا لي ولا علي.
‘হায় আফসোস! আমি যদি মুক্তি পেতাম, আমার নেকি না থাক, পাপও না থাক।’

অতঃপর বললেন-
الله الله في الصلاة.
‘নামাজে অবহেলা করা থেকে আল্লাহকে ভয় করো।’

তিনি জিজ্ঞেস করলেন-
اين ادفن?
‘আমাকে কোথায় দাফন করা হবে?’

সাহাবায়ে কেরাম বললেন- ‘আপনাকে আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পাশেই দাফন করবো।’

তিনি বললেন-
لا أزكي نفسي فما انا الا رجل من المسلمين، استأذنوا عائشة في ذلك.
‘আমি নিজেকে পাক-পবিত্র বলি না। আমিও সাধারণ মুসলমানদের একজন। তোমরা আয়েশা রাযি.-এর কাছে এই ব্যাপারে অনুমতি চাও।’

সাহাবায়ে কেরাম আয়েশা সিদ্দীকার কাছে অনুমতি চাইলে তিনি বললেন-
قدحيأت هذا المكان لنفسي، لكن والله! لأوثرن عمربه، ادفنوه مع صاحبيه.
‘আমি এই স্থান আমার জন্য নির্ধারণ করে রেখেছিলাম। কিন্তু আল্লাহর কসম! আমি উমর রাযি.কে এই ব্যাপারে প্রাধান্য দিবো। তোমরা তাকে তার দুই সাথীর সাথে দাফন করে দাও।’
অতঃপর তাকে তার প্রিয় দুই সাথীর পাশেই দাফন করা হয়। আল্লাহতাআলা হজরত উমর বিন খাত্তাব রাযি.কে ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর পক্ষ থেকে সর্বোত্তম প্রতিদান দান করুন, আমীন।

মাওলানা খ‌া‌লিদ সাইফুল্লাহ আইয়ূবী

(সিয়ার আ’লামুন নুবালা: ৮৮, তাবকাত সাআদ: ৩/২৫৫, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া: ১০/১৮০, মুয়াত্তায়ে ইমাম মালেক: ২/৮২৪, আল-হুরুফুয-যাহাবিয়্যা)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *