কুরআনের পরিচয়

কুরআনের পরিচয় ও হকসমূহ

ইসলাম প্রতিদিন কুরআন ও সুন্নাহ

কুরআনের পরিচয় ও হকসমূহ

কুরআনের পরিচয় পর্ব -১
                                        কুরআনের পরিচয়

কুরআনের পরিচয় পর্ব -১

আল্লাহ পাক মানবজাতিকে দেহ এবং আত্মার সংমিশ্রণে সৃষ্টি করে একদিকে যেমন তাদের দৈহিক ও বাহ্যিক লালন-পালনের জন্য চন্দ্র-সূর্য, আকাশ-পৃথিবী, বৃক্ষলতা, শ্যামল-বনরাজী, শস্য সমৃদ্ধ বিপুল প্রান্তর প্রভৃতি সৃষ্টি করেছেন এবং এই সবকিছুকে মানবের সেবায় নিয়োজিত রেখেছেন; অপরদিকে তেমনি যুগে যুগে অগণিত আম্বিয়ায়ে কিরাম ও অসংখ্য আসমানী গ্রন্থ প্রেরণ করে মানবের রূহানী ও আধ্যাত্মিক মননশীলতা, নৈতিকতা এবং সাংস্কৃতিক চাল-চলন ও আচার-আচরণগত প্রতিপালনেরও এক নিখুঁত ও সুবিশাল আয়োজন করেছেন। এ সম্পর্কে আল্লাহ পাক সূচনাতেই মানবজাতিকে সতর্ক করে দিয়েছেন।

কুরআনের পরিচয় প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-

فَاِمَّا يَأْتِيَنَّكُمْ مِنِّىْ هُدًى فَمَنْ تَبِعَ هُدَاىَ فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُوْنَ.

‘তোমাদের নিকট আমার পক্ষ থেকে যখন হেদায়েত (ওহীর মাধ্যমে অবতীর্ণ খোদায়ী বিধানমালা) পৌঁছবে, তখন যারা আমার এই হেদায়েতের অনুসরন করবে, তাঁদের উপর না কোন ভয় আসবে, না কোন কারনে তারা চিন্তাগ্রস্ত ও সন্তপ্ত হবে।’-সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ৩৮

আধ্যাত্মিক প্রতিপালনের এই সুমহান ধারার সূচনা হয় দুনিয়ার প্রথম মানুষ, প্রথম নবী হযরত আদম আলাইহিস সালাম এবং তাঁর প্রতি অবর্তীণ ‘ছুহুফে আদম’ (নির্দেশমালা সম্বলিত কিছু কপি) থেকেই। অতঃপর হযরত নূহ, হযরত ইবরাহীম, হযরত মূসা এবং হযরত ঈসা আলাইহিমুস সালামের কাল অতিক্রম করে সর্বশেষে এই ধারার পূর্ণাংগ বিকাশ ঘটে খাতামুন নাবিয়্যীন, সাইয়্যিদুল মুরসালীন হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পূত-পবিত্র জীবনে এবং তাঁর প্রতি অবতীর্ণ সর্বশেষ আসমানী গ্রন্থে। বস্তুতঃ মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে মানবজাতির জন্য অবতীর্ণ সর্বশেষ এই মহা গ্রন্থই হচ্ছে ‘আল-কুরআন।’

অতীতের সকল নবীর দাওয়াত এবং আসমানী গ্রন্থসমূহের সার-নির্যাস এই ‘আল-কুরআন’। আসমানী গ্রন্থসমূহে বর্ণিত সকল তত্ত্ব ও তথ্যের বিস্ময়কর সমাবেশ ঘটেছে এতে। কুরআনের আবির্ভাব ও অবতরণের পর অন্য কোন গ্রন্থের কার্যকারিতা আর অবশিষ্ট থাকেনি। একাধারে সকল আসমানী গ্রন্থই মানসুখ বা রহিত হয়ে যায়। সুতরাং সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ এই মহাগ্রন্থ বিশ্ব মানবাতার অধ্যাত্মিক ও নৈতিক সংরক্ষন, প্রতিপালন ও প্রশিক্ষনের একমাত্র উৎস, সৃষ্টির সর্বংগীন কল্যাণ কামনায় অনবদ্য অবদান।

আল-কুরআন আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের প্রত্যক্ষ কালাম; সুমহান বাণী-গ্রন্থ। এর ভাব ও বিষয়বস্তু যেমন আল্লাহর নিজস্ব, তেমনি এর প্রতিটি শব্দ এবং ভাষাও আল্লাহর নিজস্ব। তাই সৃষ্টির তুলনায় আল্লাহর অদ্বিতীয় মহিমার মতই বাণীর জগতে আল-কুরআনেরও অদ্বিতীয় মহিমা এবং মর্যাদা ও মান।

কুরআনের পরিচয় প্রসঙ্গে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

اِنَّ هٰذَا الْقُرْاٰنَ حَبْلُ اللهِ وَهُوَ النُّوْرُ الْمُبِيْنُ وَالشِّفَاءُ النَّافِعُ عَقْدٌ لِّمَنْ تَمَسَّكَ بِه وَنَجَاةٌ لِّمَنْ تَبِعَهٗ.

‘আল-কুরআন আল্লাহর রশি, বিশলকায় আলো; অব্যর্থ মহৌষধ। যে আঁকড়ে ধরবে তার জন্য শক্ত বন্ধন, যে অনুকরণ করবে তার জন্য মহামুক্তির সনদ।’ -আল-হাকীম ও আল বায়হাক্বী

কুরআনের পরিচয় পর্ব -২
কুরআনের পরিচয় পর্ব -২

তাওরাত, যাবুর, ইনজিল ও আল-কুরআন থেকে নির্বাচিত চার কথা

জনৈক জ্ঞানী লোক আসমানী প্রসিদ্ধ কিতাব থেকে সর্বমোট চারখানা কথাকে নির্বাচন করেছেন। যেগুলোতে ফুটে উঠেছে সেই চারখানা কিতাবের সবকটির সারকথা।

তাওরাত : তাওরাত থেকে নির্বাচন করা কথাটি হলো- “যে ব্যক্তি শুধু এতটুকুর উপরই সন্তুষ্ট হয়ে যায়, যতটুকু আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাকে দান করেছেন, সে ইহ ও পরকালে আরাম-আয়েশের মহাসম্পদ লাভে ধন্য হবে।”

যাবুর : যাবুর থেকে নির্বাচন করা কথাটি হলো- “যে ব্যক্তি মানুষ থেকে সরে একাকী জীবন-যাপন করবে, সে ইহ ও পরকালীন সর্বপ্রকার চিন্তা ও পেরেশানী থেকে মুক্ত থাকবে।”

ইনজীল : ইনজীল থেকে নির্বাচন করা কথাটি হলো- “যে ব্যক্তি কুপ্রবৃত্তির চাহিতাগুলো মিটিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে, সে ইহ ও পরকালে ইজ্জত লাভ করবে।”

আল-কুরআন : কুরআনুল কারীম থেকে নির্বাচন করা কথাটি হলো- “যে ব্যক্তি তার যবানকে হেফাযত করতে পেরেছে, সে ইহ ও পরকালে নিরাপদ থাকবে।”

কুরআনের পরিচয়
কুরআনের পরিচয় পর্ব -৩

কুরআনে কারীমের মৌলিক হক চারটি

১. আযমত অর্থাৎ সবচেয়ে বেশি ভক্তি, তা‘যীম করা।

২. মুহাব্বত অর্থাৎ সবচেয়ে বেশি আন্তরিক ভালোবাসা থাকা।

৩. তিলাওয়াত মা‘আস সিহহাত, অর্থাৎ সহীহ শুদ্ধরূপে তিলাওয়াত করা।

৪. ইত্বা‘আত অর্থাৎ পবিত্র কুরআনের হুকুম-আহকামের উপর আমলের নিয়্যত করা।

এছাড়া একজন মুমিনের উপর কুরআনের আরো অনেক হক রয়েছে। সে হকসমূহ জানা এবং যথাসম্ভব তা আদায়ে সচেষ্ট হওয়া প্রত্যেকের জন্য জরুরী। এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনার জন্য স্বতন্ত্র গ্রন্থের প্রয়োজন।

এখানে সংক্ষিপ্তকারে কুরআনের বিশষ কয়েকটি হক উল্লেখ করা হলো–

১. কুরআনের উপর পরিপূর্ণ ঈমান আনা এবং কুরআনের প্রতিটি শব্দ ও বাক্য খোদাপ্রদত্ত হওয়ার ব্যাপারে সুদৃঢ় বিশ্বাস রাখা।

২. কুরআনের পয়গামকে নিজের মাঝে ধারণ ও জীবনের সকল ক্ষেত্রে তার বিধি-বিধানের পূর্ণ অনুসরণ করা।

৩. সঠিক পদ্ধতিতে সাধ্যানুযায়ী কুরআনের মাঝে ‘তাদাব্বুর’ ও ‘তাফাক্কুর’ করা অর্থাৎ গভীর ধ্যানমগ্নতার সাথে কুরআন পাঠ করা এবং উপদেশ গ্রহনের জন্য তার ভাব ও পয়গাম নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা। বিশেষভাবে কুরআনে বর্ণিত বিভিন্ন ঘটনা, উপমা ও নসীহতসমূহের ব্যাপারে চিন্তা-ফিকির করে করে কুরআনের আলো আহরণ করা এবং নিজের ঈমান-আমলের উন্নতি সাধন করা।

৪. নিজের স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি ও অধীনদেরকে কুরআন শেখানো এবং কুরআনের আদর্শ অনুযায়ী তাদের জীবন গড়ে তোলার জন্য চেষ্টা-ফিকির করা।

৫. দিনে-রাতে যখনই সুযোগ হয়, গভীর ভালোবাসা ও ভক্তি সহকারে বিশুদ্ধভাবে কুরআন তিলাওয়াত করা। যতটুকু তিলাওয়াত করবে, ততটুকু সর্বদা জারি রাখা। যাতে ভুলে না যায়। কারণ, ভুলে গেলে তিলাওয়াত করা আর না করা উভয়ই সমান।

৬. যদি কারো কুরআন শরীফের তরজমা (অনুবাদ) পড়তে আগ্রহ প্রকাশ পায়, তবে নিজের মতামত দেখা চাই না, কারণ এতে ভুল বুঝার প্রবল আশংকা থাকে। এমতাবস্থায় কোন ভাল আলেমের নিকট সবক নিয়ে পড়া উচিত।

৭. মনে-প্রাণে কুরআনকে ভালোবাসা এবং তার প্রতি পরিপূর্ণ শ্রদ্ধা ও আদব বজায় রাখা একান্ত প্রয়োজন। কুরআন শরীফের দিকে পা মেলে বা পিঠ করে বসবে না। কুরআন শরীফ নীচু জায়গায় রেখে বসবে না এবং তা মাটি বা খালি বিছানার উপর রাখবে না, রেহাল বা বালিশের উপর রাখবে।

৮. যদি কুরআন শরীফ পুরাতন হয়ে ছিঁড়ে ফেটে যায়, তবে তা যত্নের সাথে একটুকরো কাপড়ে জড়িয়ে এমন কোন পবিত্র স্থানে দাফন করে (গেড়ে) দিবে, যে স্থানে লোকের পা না পড়ে।

৯. যখন কুরআন শরীফ পড়বে, তখন মনে মনে এ ধ্যান জমিয়ে রাখবে যে, তুমি যেন আল্লাহ তা‘আলার সাথে কথা-বার্ত বলতেছ। যদি এরূপ করতে পার, তবে দেখবে যে, তোমার অন্তর কেমন আলোকিত হয়, দিলের মধ্যে কেমন নূর পয়দা হয়।

১০. কুরআনের ঐশী পয়গাম, তার হেদায়াতবার্তা অন্যের কাছে পৌঁছে দেয়া এবং কুরআন আমাদের জন্য যে মহান শিক্ষা নিয়ে এসেছে, তার প্রচার-প্রসারে যথাসাধ্য চেষ্টা করা।

কুরআনের এ সকল দাবি ও হকগুলো আদায় করা আমাদের প্রত্যেকের জন্য জরুরী। সাথে সাথে কুরআনের শিক্ষার্থীদেরকে কুরআন শিক্ষার পাশাপাশি কুরআনে কারীমের হকের বিষয়েও শিক্ষা দেয়া নেহায়েত দরকার। কিন্তু এমন ক‘জন আছেন যারা যথারীতি এ সকল হক আদায় করে থাকেন? অন্যান্য হকের কথা বাদ দিলেও ক‘জন পাওয়া যাবে, যারা নিয়মিত শুধু কুরআন তিলাওয়াত করেন? আফসোসের বিষয় হলো, অসংখ্য মুসলমান কুরআনের বিশুদ্ধ তিলাওয়াতটুকুও করতে জানে না। এমনকি দ্বীনের প্রচার-প্রসারে রত অনেক দাঈ ব্যক্তিও এ ব্যাপারে অসচেতন।

কুরআনের পরিচয়

কুরআনের পরিচয় পর্ব -৪

দরসে কুরআন

আল্লাহ তা’য়ালা কালামে পাকে ঘোষনা করেন ان الصلوة تننهى عن الفحشاء والمنكر  নিশ্চয় ছালাত (নামায) মানুষকে মন্দ ও গর্হিত কাজ থেকে বিরত রাখে। ইসলাম একটি পরিপূর্ণ ধর্ম আর তার পরিপূর্ণতার স্তম্ভ নির্ধারণ করা হয়েছে পাঁচটি। যার মধ্যে অন্যতম হল নামায।

ছালাত শব্দের ব্যাখ্যা :ছালাত শব্দটি একবচন এর বহুবচন হল ছালাওয়াত। ক্ষেত্র বিশেষ এর কয়েটি অর্থ পাওয়া যায়। যেমন জনৈক কবীর ভাষায় :

صلوة را معنى آمددر لغت چار** درود وتسبيح ورحمت و استغفار   

* رحمت   দয়া বা করুনা, মহান আল্লাহ তা’য়ালার সাথে যখন সম্পর্ক করা হবে তখন তার অর্থ হবে দোয়া। 

*استغفار ক্ষমা প্রার্থনা করা, যখন ফেরেশ্তাদের সাথে ছালাতের সম্পর্ক হবে তখন তার হবে ক্ষমা।

* تسبيح পবিত্রতা বা গুন কীর্তন করা, পশু-পাখী বা জড় পদার্থের সাথে যখন ছালাতের সম্পর্ক হবে তখন তার অর্থ হবে গুন কীর্তন করা।

* درود يا دعاء দুরূদ বা দোয়া অর্থাৎ প্রার্থনা করা, যখন ছালাতের সম্পর্ক মানুষের সাথে হবে তখন তার অর্থ হবে দোয়া।

ছালাতের পারিভাষিক অর্থ : صلوة এমন এক উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন এবাদত যা নির্ধারিত সময়ে নির্ধারিত কতগুলো কাজেصلوة  শব্দটির واو এর পূর্বাক্ষরে যবর হওয়ায়, আরবী ব্যকরণের নীয়মানুসারে واو কে আলিফ দ্বারা পরিবর্তন করা হয়েছে। তবে লিখার সময় واو টি বিদ্যমান থাকবে। কিস্তু পড়ার সময় واو টি পড়া যাবেনা। যেমন مشكوة, زكوة,  ইত্যাদি। মূলকথা হল নামাযের ব্যাপারে আল্লাহ তা’য়ালার ঘোষনা যে, নামায নামাযীকে পাপ কর্ম থেকে ফিরিয়ে রাখে। অথচ আমরা সমাজে এর বিপরীত দেখতে পাই। অর্থাৎ যারা নামায পড়ে তারা গুনাও করে তাই এখানে বুঝার বিষয় হচ্ছে যে, এটা কোন নামায যা মানুষকে গুনাহ থেকে বিরত রাখে? আল্লাহর নবী হাদীস শরীফে নামায সম্পর্কে বলেন أن تعبد الله كانك تراه فان لم تكن تراه فانه يراك   অর্থাৎ তুমি এমন ভাবে নামায পড়বে যেমন তুমি আল্লাহ তা’য়ালাকে দেখছ, তেমনি ভাবে আল্লাহ তা’য়ালাও তোমাকে দেখছেন। এই অবস্থাকে মুশাহাদা বলা হয়। আর যদি এই অবস্থা অর্জিত না হয় তাহলে কম পক্ষে এমন ভাবে নামায পড়বে যে আমি যদিও আল্লাহ তা’য়ালাকে দেখিনি কিন্তু আমার আল্লাহ তা’য়ালা আমাকে দেখছেন। এই অবস্থাকে মুরাকাবা বলা হয়। যদি কম পক্ষে এই অবস্থা অজির্ত হয় তাহলে আশা করা যায় ধীরে ধীরে অবশ্যই সে গুনাহর কাজ থেকে ফিরে আসবে।

নামাযের গুরুত্ব : নামাযের গুরুত্ব বুঝানোর জন্য শুধু এতটুকই যথেষ্ট যে, নামাযের আলোচনা সূরায়ে বাক্বারার  তিন নাম্বার আয়াত থেকে শুরু করে পবিত্র কুরআনের প্রায় একাশি জায়গায় করা হয়েছে। হাদীস শরীফে নামায সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, যে ব্যক্তি নামায প্রতিষ্ঠা করল সে যেন দ্বীনকে প্রতিষ্ঠা করল। আর যে ব্যক্তি নামায ছেড়ে দিল সে দ্বীনকে ধ্বংস করে দিল। আরেক হাদীসে বলা হয়েছে যে, নামাযের গুরুত্ব ধর্মের মাঝে ততটুকু মানুষের সাড়ে তিন হাত বডির মধ্যে তার মাথার গুরুত্ব যতটুকু। এমনকি বলা হয়েছে যে ব্যক্তি নামায ছেড়ে দিল সে যেন কুফুরী করে ফেলল। নামায তরক করার (পরিনতি) তো বলা বাহুল্য শুধু কাজা করার ব্যাপারে বলা হয়েছে এক ওয়াক্তের বিনিময় আশি হুকবা তথা তিন লক্ষ আঠাশি বৎসর জাহান্নামের প্রজ্জলিত আগুনে জলতে হবে। নামায সম্পর্কে এত কঠোরতা কেন করা হল এ নিয়ে যদি আমরা একটু চিন্তা গবেষনা করি তাহলে আমরা দেখতে পাই একমাত্র নামাযই এমন ইবাদত যা আদায় করলে দুনিয়ার অন্যান্ন সৃষ্টজীবের ইবাদতের সামঞ্জস্য হয়ে যায়, সাথে সাথে ইসলামের অন্য চারটি স্তম্ব ও আংশিক ভাবে হলেও নামাযের মধ্যে পাওয়া যায়। যেমন নামাযের একটি রূকন হল কিয়াম তথা সোজা হয়ে দাড়ানো। আল্লাহ তা’য়ালার সৃষ্টজীবের মধ্যে এমনও কিছু মাখলোকাত রয়েছে যা জন্মের সূচনা কাল থেকেই সোজা দাড়িয়ে আল্লাহ তা’য়ালার হুকুম পালন করে আসছে। যেমন গাছ-পালা, বৃক্ষলতা ইত্যাদি। আরেকটি রূকন হচ্ছে রুকু, তথা মাথাকে ঝুকানো অর্থাৎ নামাযী তার কোমর বরাবর পিঠ ও মাথাকে নুয়ে রাখবে। আল্লাহ তা’য়ালার সুষ্ট মাখলোকাতের মধ্যে এমন ও কিছু মাখলোক রয়েছে যারা জন্ম লগ্ন থেকেই রুকু অবস্থার ন্যায় আল্লাহ তা’য়ালার হুকুম পালন করে আসছে। যেমন গরু, ছাগল, ঘোড়া, মহিষ ইত্যাদি। আরেকটি রূকন হচ্ছে সুজুদ বা সিজদা করা অর্থাৎ মানব শরীরের শ্রেষ্ঠ অঙ্গ চেহারা সহ হাত, পা, হাটুকে জমিনে লাগিয়ে রাখা। আল্লাহ তা’য়ালার সৃষ্ট মাখলোকাতের মধ্যে এমন ও কিছু সৃষ্ট মাখলোক রয়েছে যারা জন্ম থেকেই সিজদার সুরতে আল্লাহ তা’য়ালার হুকুম আহকাম পালন করে আসছে। যেমন সাপ, বিচ্ছু ইত্যাদি। অপর দিকে নামায আদায় কালে ইসলামের অন্য চারটি স্তম্ভ কালীমা, যাকাত, রোযা ও হজ্ব আংশিক ভাবে হলেও আদায় হয়ে যায়। যেমন

প্রথমত : কালেমা হল আল্লাহ তা’য়ালার একত্ববাদের স্বীকারোক্তি ও তার নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রিসালতের সাক্ষ্য দেওয়া। নামাযী যখন নামাযে দাড়ায় প্রথমেই আল্লাহু আকবার ও সুবহানাকা পাঠ করে যার দ্বারা আল্লাহ তা’য়ালার বড়ত্ব ও একত্ব বাদের বর্হিপ্রকাশ ও স্বীকারোক্তি হয়ে যায়। এবং যখন তাশাহুদ পাঠ করে তখন রিসালতের সাক্ষ্য প্রদান হয়ে যায়। তাইতো তাকবীর ও তাশাহুদ ব্যতিত কোন নামাযই হতে পারেনা।

দ্বিতীয়ত : রোযা হল নিয়তের সাথে খানা পিনা ও স্ত্রী ব্যবহার এই তিন কাজ থেকে বিরত থাকার নাম। নামাযী যতক্ষন নামাযে থাকবে তার জন্য এই তিন কাজ হারাম। এমনকি যদি কোন ব্যক্তি খোলা আকাশের নিচে নামায পড়ে এবং হাই নিতে গিয়ে বৃষ্টির পানি মুখে পড়ে ভিতরে চলে যায় তার নামায নষ্ট হয়ে যাবে।

তৃতীয়ত : যাকাত হলো নিসাব পরিমান মালের মালিক তার মালের চল্লিশ অংশের এক অংশ মাল গরীব মিসকীন তথা অন্যের হাতে দিয়ে দেওয়া। তেমনি নামাযী ব্যক্তিও তার সতর ঢাকার পরিমান কাপড় ক্রয় করতে নিজের টাকা অন্যের হাতে দিতে হয়। এমনকি সামর্থ থাকা সত্ত্বে সতর খোলা অবস্থায় নামায পড়লে নামায হবেনা।

চতুর্থত : হজ্ব হল বায়তুল্লা শরীফকে উদ্দেশ্য করে মক্কা শরীফে পৌছে আল্লাহ তা’য়ালার ঘর কা’বা শরীফকে তাওয়াফ করা। অর্থাৎ হজ্বের সম্পর্ক কাবা শরীফের সঙ্গে। ঠিক তেমনি ভাবে নামাযের সম্পর্কও হচ্ছে কা’বা শরীফের সাথে। তাইতো যদি কোন নামাযী জেনে শুনে কা’বা শরীফের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে অন্য দিকে মুখ করে নামায পড়ে তাহলে তার নামায হবে না।

হে পাঠক মহল বন্ধুগন! যে নামাযের এত গুরুত্ব, তা আদায়ে কেন এত দুরত্ব। তাই আসুন আজ থেকে আমরা মনে প্রাণে পরিপূর্ণ সংকল্প করি যে, যত দিন দুনিয়াতে সুস্থ অবস্থায় থাকব, নামাযকে তার ফারায়ীজ ও ওয়াজিবাত সহ জামাতের সাথে আদায় করব। আল্লাহ তা’য়ালা আমাদেরকে পাঁচ ওয়াক্তের নামায জামাতে আদায় করার তাওফীক দান করুন। আমীন।


“আল কুরআনের আদব” বিষয়ে পড়তে ক্লিক করুন

“কুরআনুল কারিমের কথা” প্রবন্ধটি পড়তে ক্লিক করুন

আরো জানতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েব সাইট রাহে সুন্নাত ব্লগ

কুরআনের পরিচয় সম্পর্কে জানতে ভিজিট করুন আমাদের সাইটে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.