কুরআনে কারীমের প্রতি উমর রাযি.-এর আনুগত্য || সংকলক : অধ্যক্ষ মুহাম্মদ মিজানুর রহমান চৌধুরী || রাহে সুন্নাত ব্লগ

Blog (ব্লগ) রাহে কুরআন
কুরআনে কারীমের প্রতি উমর রাযি.-এর আনুগত্য
সংকলক : অধ্যক্ষ মুহাম্মদ মিজানুর রহমান চৌধুরী 
নাযেম, মাদরাসা দাওয়াতুল হক, দেওনা, কাপাসিয়া, গাজীপুর
 
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. বর্ণনা করে, হযরত উমর রাযি.-এর খেলাফতের সময় একবার উয়ইনা ইবনে হিস্ন মদিনায় এসে তার ভাতিজা হুর ইবনে কায়েসের নিকট অবস্থান করল। হুর ইবনে কায়েস ছিলেন উমর রাযি.-এর মজলিসে শুরার একজন সদস্য। সাধারণত কুরআনের হাফেজ-আলেমগণই উমর রাযি.-এর মজলিসে শুরার সদস্য হতেন। একদিন উয়াইনা হুর ইবনে কায়েসকে বলল, তুমি তো আমিরুল মুমিনের কাছের মানুষ। তাঁর সাথে একটু সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দাও! হুর ইবনে কায়াস তখন উমর রাযি. কে অনুরোধ করলে তিনি উয়াইনাকে সাক্ষাতের অনুমতি দেন।
উমর রাযি.-এর সাথে সাক্ষাত করা মাত্রই উয়াইনা বলে উঠল, হে আমীরুল মুমিনীন! আপনি না আমাদেরকে প্রাপ্য অধিকার দেন আর না আমাদের সাথে ইনসাফ ও ন্যায়সম্মত আচরণ করেন। এ কথা শুনে উমর রাযি. অত্যন্ত রাগান্বিত হন। তখন হুর ইবনে কায়াস বলল, আমীরুল মুমিনীন! আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন :
خُذِ الْعَفْوَ وَأْمُرْ بِالْعُرْفِ وَاَعْرِضْ عَنِ الْجَاهِلِيْنَ
‘ক্ষমতাপরায়ণতা অবলম্বন কর, সৎকাজের আদেশ কর এবং অজ্ঞ লোকদের এড়িয়ে চল।’ -সুরা সাজদা (৩২) : ১৬।
আর এ ব্যক্তিও মূর্খদের অন্তর্ভুক্ত। তাই আল্লাহ তা‘আলার হুকুম অনুযায়ী এর কথা উপেক্ষা করুন। এ আয়াত শুনামাত্র উমর রাযি. একেবারে শান্ত হয়ে গেলেন। উয়াইনাকে কিছুই বললেন না। কারণ তিনি ছিলেন وَقَّافٌ عِنْدَ كِتَابِ اللهِ (আল্লাহ তা‘আলার হুকুমের সামনে পূর্ণ সমর্পিত একজন মানুষ।) -সহীহ বুখারী, হাদীস ৪৬৪২
সংবাদ পাওয়ার সাথে সাথেই বাইতুল্লাহর দিকে ঘুরে যাওয়া 
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা থেকে হিজরত করে যখন মদীনায় গেলেন, তখন আল্লাহ তা‘আলার হুকুমে প্রথম ষোলো-সতের মাস বাইতুল মুকাদ্দাসের দিকে ফিরেই নামায আদায় করেন। তবে নবীজীর দিলের তামান্না ছিল, বাইতুল্লাহ যেন হয় কেবলা। অবশেষে আল্লাহ তা‘আলা নবীজীর দিলের তামান্না পূরণ করে বাইতুল্লাহকে কেবলা হিসেবে গ্রহন করার হুকুম নাযিল করেন। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন-
قَدْ نَرَى تَقَلُّبَ وَجْهِكَ فِىْ السَّمَاءِ فَلَنُوَلِّيَنَّكَ قِبْلَةً تَرْضَاهَا فَوَلِّ وَجْهَكَ شَطْرَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ
নিশ্চয় আমি আপনার মুখ বার বার আকাশের দিকে উঠতে দেখছি। সূতরাং আমি অবশ্যই আপনাকে সেই কেবলার দিকে ফিরিয়ে দেব, যা আপনি পছন্দ করেন। অবএব, এখন আপনি স্বীয় মুখ মসজিদুল হারামের দিকে ফেরান।          -সূরা বাকারা (২) : ১৪৪
হযরত বারা ইবনে আযেব রাযি. এ সংক্রান্ত একটি ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, কেবলা পরিবর্তনের হুকুম নাযিল হওয়ার পর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আছরের নামায বাইতুল্লাহর দিকে ফিরে আদায় করেন। নামাযের পর এক সাহাবী বাইরে বেরিয়ে দেখেন, এক মসজিদে লোকজন আগের মতো বাইতুল মুকাদ্দাসের দিকেই মুখ করে নামায আদায় করছে। তিনি তখন আওয়াজ দিয়ে বললেন, বাইতুল্লাহর দিকে মুখ করে নামায পড়ার হুকুম নাযিল হয়েছে। আমি এখনই নবীজীর সাথে বাইতুল্লাহর দিকে মুখ করে নামায পড়ে এসেছি। মুসল্লিরা তখন রুকু অবস্থায় ছিল। ঘোষণা শুনামাত্র সে অবস্থায়ই তাঁরা বাইতুল্লাহর দিকে ঘুরে যান।
-সহীহ বুখারী, হাদীস ৪৪৮৬; সহীহ মুসলিম, হাদীস ৫২৫; তাফসীরে ইবনে কাসীর ২/১০৭-১০৮
হযরত ইবনে উমর রাযি. বলেন, কুফাবাসীদের কাছে পরের দিন ফজরের নামাযের সময় এ সংবাদ পৌঁছে। তাঁরাও তখন নামাযরত অবস্থায় বাইতুল্লাহর দিকে মুখ করে নেন।
-সহীহ বুখারী, হাদীস ৪০৩; সহীহ মুসলিম, হাদীস ৫২৬; তাফসীরে ইবনে কাসীর ২/১০৯-১১০
কুরআন মাজীদে কেবলা পরিবর্তনের হুকুমের একটি হেকমত এটাও বলা হয়েছে-
لِنَعْلَمَ مَنْ يَّتَّبِعُ الرَّسُوْلَ مِمَّنْ يَّنْقَلِبُ عَلٰى عَقِبَيْهِ
যাতে আমি জানতে পারি যে, কে রাসূলের অনুসরণ করে, আর কে পেছনের দিকে ফিরে যায় (অর্থাৎ তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করে)। -সূরা বাকারা (২) :১৪৩
এটা তো জানা কথা, এ ধরনের পরীক্ষায় সাহাবায়ে কেরাম সবসময়ই উত্তীর্ণ হয়েছেন। তবে এ ঘটনায় যে বিষয়টি বিশেষভাবে লক্ষণীয় তা হল, সাহাবায়ে কেরাম নামাযের মধ্যে যে অবস্থায় ছিলেন, হুকুম শুনামাত্র সে অবস্থায়ই বাইতুল্লাহর দিকে ঘুরে যান। তাদের এ কথা ভাবারও তো সম্ভাবনা ছিল যে, এ নামাযটি বাইতুল মুকাদ্দাসের দিকে ফিরেই শেষ করি। পরবর্তি নামায থেকে বাইতুল্লাহর দিকে মুখ করব। কিন্তু কুরআনের আদেশ পালনে নিবেদিতপ্রাণ সেসব মনীষীদের এতটুকু বিলম্ব কীভাবে সহ্য হতে পারে! তাঁদের জীবনে এমনই ছিল“  سَمِعْنَا وَاَطَعْنَا” এর বাস্তবায়ন।
কুরআনের সত্যিকার পতাকাবাহী
হযরত সালেম মাওলা আবী হোযায়ফা রা. একজন প্রথম সারির মুহাজির সাহাবী। তিনি ছিলেন কুরআন ধারণকারী ও গভীর জ্ঞানের অধিকারী বিশিষ্ট সাহাবীদের একজন। তাঁর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট হল, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে চারজন সাহাবীর নাম উল্লেখ করে তাঁদের থেকে কুরআন শিক্ষা করার আদেশ দিয়েছেন, তিনি তাঁদেরই একজন। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৪৯৯৯
হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা. এর খেলাফতকালে ইয়ামামার প্রসিদ্ধ যুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করেছিলেন। যুদ্ধের ময়দানে কেউ তাঁকে বলল, আপনার ব্যাপারে আমাদের আশঙ্কা হয়। তাই ঝাÐা অন্য কারো কাছে দিয়ে দিন। তিনি তখন বললেন, (যুদ্ধেক্ষেত্রে আমি যদি দুর্বলতা প্রর্দশন করি), তাহলে তো আমি অতি নিকৃষ্ট কুরআন ধারণকারী। এ কথা বলেই তিনি সম্মুখে অগ্রসর হতে লাগলেন। যুদ্ধ করতে করতে তাঁর ডান হাত কেটে গেলে বাম হাতে ঝাÐা তুলে নেন। বাম হাতও কেটে গেলে ঝাÐা ঘার দিয়ে আঁকড়ে ধরেন, তবুও তা মাটিতে পড়তে দেননি। আর এ অবস্থায় তার মুখে উচ্চারিত হচ্ছিল কুরআনের এ আয়াত-
كَأَيِّنْ مِّنْ نَبِيٍّ قَاتَلَ رِبِّيُّوْنَ كَثِيْرٌ
আর কত নবী রয়েছেন, যাদের সঙ্গী হয়ে বহু আল্লাহওয়ালা যুদ্ধ করেছেন। -সূরা আলে ইমরান (৩) : ১৪৬
অবশেষে তিনি এ যুদ্ধেই শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করেন।
-উসদুল গাবাহ ২/২৬১; আলইসবাহ ফি তাময়িযিস সাহাবা ৩/১৬
কুরআন খতম : সাহাবায়ে কেরামের কর্মপন্থা
কুরআন খতমের মেয়াদের ক্ষেত্রে সাহাবায়ে কেরামের আমল বিভিন্ন রকমের ছিল। কোনো কোনো সাহাবী দুই মাসে, কেউবা প্রতি মাসে একবার কুরআন খতম করতেন। কেউ কেউ তো তিন বা চার দিনেই এক খতম তিলাওয়াত করতেন। এছাড়া আরো বিভিন্ন সময়-সীমার কথা সংশ্লিষ্ট কিতাবাদিতে পাওয়া যায়। তবে সাধারণত প্রতি সাত দিনে কুরআন খতম করাই ছিল অধিকাংশ সাহাবীর আমল। -নাতায়েজুল আফকার ১/১৪৪-১৪৬; আততিবয়ান, পৃ. ৭৫-৭৭ ফাযায়েলে কুরআন, ইবনে কাছির, পৃ. ১৩২-১৩৬; আল ইতকান ফি উলূমিল কুরআন ১/৩০৩।
কুরআন খতমের সময়-সীমার ব্যাপারে সাহাবায়ে কেরামের আমল ভিন্ন ভিন্ন হলেও তঁদের আদর্শ জীবনে যে বিষয়টি সুস্পষ্ট তা হচ্ছে, কুরআন তিলাওয়াতের প্রতি তাঁদের বিপুল আগ্রহ ও অতুলনীয় উদ্দীপনা। প্রতি সাত দিনে একবার খতম করার অর্থ হচ্ছে, প্রতি মাসে চার বার এবং সারা বছরে পঞ্চাশ কিংবা এর চেয়ে বেশি বার পূর্ণ কুরআন তিলাওয়াত করা।
নি¤েœ কয়েকজন সাহাবীর নাম ও কুরআন খতমের ক্ষেত্রে তাঁদের রীতি
তুলে ধরা হল।
হযরত উসমান রা., হযরত আয়েশা রা., হযরত তামিম দারী রা., হযরত যায়েদ বিন ছাবেত রা.-এর ব্যাপারে বর্ণিত আছে, তাঁরা প্রতি সাত দিনে এক খতম করতেন। -ফাযায়েলে কুরআন, আবু উবায়দ ১/৩৫৮; ফাযায়েলে কুরআন, ইবনে কাছির ১৩২-১৩৪; নাতায়েজুল আফকার ১৪৬-১৪৯; আততিবয়ান ৭৯-৮০।
প্রসিদ্ধ তাবেঈ আবুল আহওয়াছ বর্ণনা করেন, ইবনে মাসউদ রা. প্রতি সাত দিনে কুরআন খতম করার জন্য লোকদের তাকিদও করতেন। -নাতায়েজুল আফকার ১/১৪৯
ইবনে মাসউদ রা. বছরের অন্যান্য মাসে সাত দিনে এক খতম করলেও রমযান মাসে প্রতি তিন দিনে খতম দিতেন। -ফাযায়েলে কুরআন, আবু উবায়দ ১/৩৫০;মুখতাসারু কিয়ামিল লাইল, পৃ. ১৫৫-১৫৬, ফাযায়েলে কুরআন, ইবসে কাছির, পৃ. ১৩৬
আর হযরত সাঈদ ইবনে মুনযির আনসারী রা. এবং আবু যর গেফারী রা. প্রতি তিন দিনে কুরআন খতম করতেন। -ফাযায়েলে কুরআন, ইবসে কাছির, পৃ. ১৩৪; নাতায়েজুল আফকার ১/১৫২
আবার কোনো কোনো সাহাবী কখনো  কখনো এক রাতে বা এক রাকাতেই পুরো কুরআন খতম করেছেন।
কুরআন খতমের ক্ষেত্রে তাঁরা আরো যেসব বিষয় লক্ষ্য রাখতেন
প্রখ্যাত তাবেঈ আমর ইবনে মুররা রাহ. বলেন, সালাফের নিকট পছন্দনীয় ছিণ রাতের শুরুভাগে কিংবা দিনের শুরুভাগে কুরআন খতম করা। -আততিবয়ান, পৃ. ৮১; ইবনে আবু দাউদের সূত্রে, নাতায়েজুল আফকার ৩/১৬৭
তাবেঈ মুহাম্মদ ইবনে জুহাদাহ রাহ. বলেন, (নামাযে কুরআন খতমের ক্ষেত্রে) সালাফের পছন্দনীয় পদ্ধতি ছিল, রাতে খতম করলে মাগরিবের পুর দুই রাকাতে, আর দিনে খতম করলে ফজরের আগে দুই রাকাতে শেষ করা। -ফাযায়েলে কুরআন, আবু উবায়দ ১/২৮৬; আযযূহদ, ইবনুল মুবারক, হাদীস ৭৬০
কুরআন খতমের মজলিস একটি বরকতপূর্ণ মজলিস এবং বিভিন্ন বর্ণনা মোতাবেক তা আল্লাহর রহমতপ্রাপ্তি ও দু‘আ কবুল হওয়ার বিশেষ মূহুর্ত।    -ফাযায়েলে কুরআন, আবু উবায়দ ১/২৮৫-১৮৬; মুসান্নেফে ইবনে আবী শায়বা, হাদীস ৩০৬৬৩
তাই সাহাবায়ে কেরাম কুরআন খতমের সময় দু‘আর প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। পরিবার-পরিজনকেও তাতে শরীক করতেন। তা ছাড়া কেউ কুরআন খতম করলে তাঁর নিকট গিয়ে তাঁর সাথে দু‘আয় শরীক হতেন।
ইবরাহীম তাইমী রহ. থেকে বর্ণিত, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, যখন কোনো ব্যক্তি কুরইন খতম করে, তখন তাঁর দু‘আ কবুল হয়। ইবরাহীম তাইমী রহ. বলেন, এজন্যই আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. এর অভ্যাস ছিল, কুরআন খতম হলে পরিবার পরিজন সকলকে একত্র করে দু‘আ করতেন। আর তাঁরা সাথে সাথে আমীন আমীন বলতেন। -ফাযায়েলে কুরআন, আবু উবায়দ ১/২৮৬;
ইবনে আব্বাস রা. এর একটি ঘটনা উল্লেখ করে এ আলোচনা শেষ করছি। তিনি কুরআন খতম উপলক্ষে দু‘আর মজলিসে উপস্থিত হওয়ার প্রতি সবিশেষ যতœবান ছিলেন। হযরত কাতাদা রাহ. বলেন, মদীনার এক ব্যক্তি কুরআনের আশেক ছিল। এজন্য হযরত ইবনে আব্বাস রা. কিছু লোক ঠিক করে রেখেছিলেন যে, তাঁরা এই ব্যক্তির প্রতি খেয়াল রাখবে। যখনই তাঁর কুরআন খতমের সময় হতো তাঁরা তাকে খবর দিত এবং তিনি দু‘আর জন্য তাঁর কাছে গিয়ে উপস্থিত হতেন। -ফাযায়েলে কুরআন, আবু উবায়দ ১/২৮৬; সুনানে দারেমী, হাদীস ৩৪৮৫; নাতায়েজুল আফকার ১/১৭২
এ সকল রেওয়ায়াত ও ঘটনাগুলো থেকে কুরআন খতমের সময় দু‘আ করার এবং সে দু‘আর মজলিসে শরীক হওয়ার গুরুত্ব ও ফযীলত যেমন বোঝা যায়, তেমনি কুরআনের সাথে সাহাবায়ে কেরামের কত গভীর সম্পর্ক ও নিবিড় ভালোবাসা ছিল, তাও বোঝা যায়। কুরআনের সাথে সম্পর্ক ও ভালোবাসার এ মহাদৌলত আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকেও দান করুন। আমীন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *