কুরআনের

কুরআনে কারীমকে পুরাতন মনে করা

কুরআন ও সুন্নাহ সংস্কৃতি
কুরআনে কারীমকে পুরাতন মনে করা
সংকলক : অধ্যক্ষ মুহাম্মদ মিজানুর রহমান চৌধুরী 
নাযেম, মাদরাসা দাওয়াতুল হক, দেওনা, কাপাসিয়া, গাজীপুর
কুরআনে কারীমকে পুরাতন মনে করার ব্যাপারে হযরত মাকিল ইবনে ইয়াসার রা. বর্ণনা করেন যে, হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন : ‘মানুষের উপর এমন সময় আসবে, যখন পবিত্র কুরআনে কারীম তাদের অন্তরে পুরাতন বলে অনুভূত হবে- যেরূপ শরীরে কাপড় পুরাতন অনুভূত হয়। সে সময়ের লোকদের প্রত্যেকটি কাজ লোভ ও স্বার্থের সাথে জড়িত হবে; আল্লাহর ভয় কিছুমাত্রও থাকবে না। তাদের মধ্যে যদি কেউ নেক আমল করে, তবে সে নিজেই বলে যে, আল্লাহ কবুল করে নিবেন। আর কোন গুনাহের কাজ করলে বলে যে, আল্লাহ মাফ করবেন।’
বস্তুতঃ কুরআনে কারীমের ভীতিপ্রদ ও সতর্ককারী আয়াতসমূহ সম্পর্কে এসব লোকের কোনই জ্ঞান নাই, এজন্যেই তারা ভয় ও শাস্তির চিন্তা না করে লোভ ও স্বার্থের বশবর্তী হচ্ছে। পবিত্র কুরআনে কারীমে নাসারাদের সম্পর্কে অনুরূপ খবর দেওয়া হয়েছে, যেমন ইরশাদ হয়েছে –
فَخَلَفَ مِنْ بَعْدِهِمْ خَلْفٌ وَّرِثُوا الْكِتَابَ يَأْخُذُوْنَ عَرَضَ هٰذَا الْاَدْنٰى وَيَقُوْلُوْنَ سَيُغْفَرُلَنَا
‘তাদের পর এমন লোক তাদের স্থলাভিষিক্ত হলো, যারা তাদের নিকট থেকে (কিন্তু তারা কিতাবের বিনিময়ে) এই তুচ্ছ দুনিয়ার ধন-সম্পদ গ্রহণ করে এবং বলে যে, নিশ্চয়ই আমরা ক্ষমাপ্রাপ্ত হবো।’ আরাফ : ১৬৯
আর্থাৎ উত্তরাধিকারে তারা কিতাবী বিদ্যা প্রাপ্ত হয়েছে, কিন্তু তাদের অবস্থা এই যে, দুনিয়ার মায়া-মোহে তারা লিপ্ত হয়ে রয়েছে; হালাল-হারামের কোন বাছ-বিচার না করে প্রবৃত্তির অনুসরণে দুনিয়া উপার্জনে লিপ্ত।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন-
وَلِمَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّه جَنَّتَانِ
‘যারা আল্লাহর সম্মুখে দÐায়মান হওয়ার বিষয় ভয় করে, তাদের জন্য রয়েছে দুটি উদ্যান।’ রাহমান : ৪৬
আরও ইরশাদ হয়েছে-  ذٰلِكَ لِمَنْ خَافَ مَقَامِيْ وَخَافَ وَعِيْدِ
‘এ তাদের প্রত্যেকের জন্য, যারা আমার সম্মুখে দÐায়মান হওয়ার ভয় রাখে এবং আমার শাস্তিকে ভয় করে।’ ইবরাহীম : ১৪
কুরআনে কারীমের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবই সতর্কীকরণ ও ভয় প্রদর্শন। যে কেউ মনোযোগ ও চিন্তা সহকারে কুরআনে কারীম অধ্যয়ন করবে, অবশ্যই তার জীবনে এর প্রভাব পড়বে এবং আখেরাতের ফিকির ও আল্লাহর ভয় তার অন্তরে জাগরুক হবে; যদি সে মুমিন হয়ে থাকে। কিন্তু আজকালকার অবস্থা এই যে, মানুষ কেবল কুরআনে কারীমের বাহ্যিক উচ্চারণ ও শব্দাবলীর পেছনেই পড়ে রয়েছে; এমনকি এসব বাহ্যিকতার জন্য পরস্পর বিতর্ক ও বাহাস-মোনাযারায় পর্যন্ত মগ্ন হচ্ছে, আর তিলাওয়াতের প্রশ্নে যে ভাব ও সুর অবলম্বন করা হয়, তাতে মনে হয় যেন আরবী কবিতা ও পংক্তি আবৃত্তি করা হচ্ছে।
মোটকথা, তাদের কুরআনে কারীমের আসল অর্থ, উদ্দেশ্য এবং সে অনুযায়ী বাস্তব আমলের প্রতি মোটেই ভ্রƒক্ষেপ নাই। আফসূস! এর চেয়ে বড় বঞ্চনা ও ধোকাগ্রস্ততা দুনিয়াতে আর কি আছে? এর কাছাকাছি আফসূসজনক অবস্থা হচ্ছে তাদের যাদের আমল মিশ্রিত; কিছু ভাল আর কিছু মন্দ, কিন্তু মন্দের পরিমাণই বেশী। এতদসত্তে¡ও তারা এই ধারণায় মত্ত রয়েছে যে, তাদের নেকীর পাল্লা ভারী হবে। বস্তুতঃ এরাও পূর্বোক্তদের ন্যায় ধোকা ও প্রতারণার শিকার হয়েছে। নিঃসন্দেহে এটা অনেক বড় জাহালত ও মূর্খতা বৈ কিছু নয়। ধোকা ও প্রতারণার শিকার এ উভয়বিধ লোকদেরকে তুমি দেখবে- একদিকে তারা হালাল-হারামে মিশ্রিত যৎসামান্য সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় সদকা করে, কিন্তু অপরদিকে মুসলমানদের প্রচুর পরিমাণ মাল-সম্পদ আত্মসাৎ করছে এবং অন্যান্য হারাম উপায়ে সম্পদ উপার্জনে মত্ত রয়েছে। আর এহেন হারাম থেকেই সদকা-খয়রাত করে মুক্তি ও নেকীর আশা করে রয়েছে। তারা মনে করে নিয়েছে যে, হারাম উপায়ে অর্জিত কিংবা হালাল উপায়েই হোক, তা থেকে দশ দিরহাম সদকা করে দিলে হারামের হাজার দিরহাম তাদের জন্য হালাল হয়ে যাবে। ধিক্ তাদের মানসিকতার উপর। বস্তুতঃ এটা এমন হলো যে, দাঁড়ির এক পাল্লায় দশ দিরহাম অপর পাল্লায় হাজার দিরহাম রেখে দশের পাল্লায় ওজন হাজারের পাল্লা অপেক্ষা ভারী হওয়ার প্রত্যাশা করলো। আফসূস! অজ্ঞতারও তো কোন অবধি থাকা চাই।
আবার এদের মধ্যে অনেকেই এমন রয়েছে, যারা ধারণা করে যে, তাদের নেক আমলের পরিমান মন্দ আমল অপেক্ষা বেশী। কাজেই নফসও প্রবৃত্তির হিসাব-মোহাসাবা ও নিয়ন্ত্রণের প্রতি মোটেই আগ্রহী হয় না এবং মন্দ ও গুনাহের কার্যাবলী মিটাতে এতটুকু চেষ্টারত হয় না। বরং সামান্য কিছু ইবাদত ও নেক আমল করে ফেললে সেটা হিসাব কষে স্মরণশক্তির মণিকোঠায় সংরক্ষিত করে রাখে। যেমন কেবল মুখে ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ উচ্চারণ করে কিংবা দিনে একশতবার ‘সুবহানাল্লাহ’ পড়ে অবশিষ্ট সম্পূর্ণ সময় মুসলমানদের কুৎসাবাদ, নিন্দা-গীবত, ইয্যত-সম্মান বিনষ্টকরণ ও আল্লাহর মর্জির খেলাফ অজস্র-অগণিত অন্যায় ও অপরাধমূলক কাজে লিপ্ত রইল আর মনে মনে প্রত্যাশা করলো যে, ‘সুবহানাল্লাহ’ ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ পড়ে রেখেছি; এর বিনিময়ে নেকী লাভ করবো। অথচ সারাদিনব্যাপী যেসব অন্যায় ও অহেতুক কথায় লিপ্ত রয়েছে তাতে যে পরিমাণ গুনাহ হলো, তা পূর্বোক্ত একশত বার তাসবীহ বরং হাজার বার অপেক্ষা অনেকগুণ বেশী এবং ফেরেশতাগণ তা লিপিবদ্ধও করে নিয়েছেন- সেদিকে মোটেও খেয়াল করলো না। এদিকে আল্লাহ তা‘আলা মানবের প্রতিটি কথার হিসাব-নিকাশের বিষয় পবিত্র কুরআনে কারীমে ঘোষনা করে রেখেছেন, ইরশাদ হয়েছে-
مَا يَلْفِظُ مِنْ قَوْلٍ اِلَّا لَدَيْهِ رَقِيْبٌ عَتِيْدٌ
‘সে (মানুষ) যে কোন কথা মুখ হতে বের করা মাত্র তার নিকটেই একজন নেগাহবান (ফেরেশতা) প্রস্তুত রয়েছে (সে লিপিবদ্ধ করে নেয়)।’ কাহাফ : ১৮
অথচ এসব লোক সবসময়ই কেবল তাদের তাসবীহ, তাহলীল ও সওয়াব গণনার মধ্যেই থেকে যায়; ওদিকে গীবত, মিথ্যা, চুগলখোরী ও মুনাফেকী প্রভৃতি পাপে লিপ্ত লোকদের জন্য যে কি মর্মন্তুদ শাস্তি রয়েছে, সেদিকে মোটেও দৃষ্টিপাত করে না। বস্তুতঃ এ সবকিছু ধোকা ও প্রতারণার শিকার হওয়ার জঘন্যতম পরিণতি ছাড়া কিছু নয়। অবস্থা এই যে, তাদের ‘সুবহানাল্লাহ’ পাঠে যতটুকু নেকী হয়েছিল, অন্যায় ও বেহুদা কথার একাংশ দ্বারাই তা শেষ হয়ে গেছে; এর অতিরিক্ত অন্যায় ও বেহুদা কথা লিপিবদ্ধ করার বিনিময়ে ফেরেশতাগণ যদি তাদের নিকট পারিশ্রমিক দাবী করে তবে অবশ্যই তারা নিজেদের জিহদকে সংযত করে নিবে এবং অন্যায় বা বেহুদা কথা থেকে অবশ্যই বিরত হবে; এমনকি জরুরী আবশ্যকীয় কথা বলাও বন্ধ করে দিবে। আর কড়া হিসাব করে রাখবে, যাতে তাসবীহের সংখ্যা অপেক্ষা বেহুদা বাক্যালাপের সংখ্যা বেড়ে না যায়; যার ফলে পারিশ্রমিক প্রদানের অর্থদÐে পতিত হতে না হয়।
অতীব আক্ষেপ ও পরিতাপের সাথে আশ্চর্যান্বিত হতে হয় এদের অবস্থা দৃষ্টে যে, দুনিয়ার সামান্যতম সম্পতের জন্য কড়া অংক কষে হিসাব-নিকাশে কোন ক্রটি করে না, বরং সর্বদা শংকিত সাবধানতা অবলম্বন করে থাকে, যাতে পার্থিব সামান্যতম অংশও বরবাদ না হয়। অথচ অতি উচ্চতর মর্যাদার স্থান জান্নাতুল ফেরদাউস ও তন্মধ্যস্থ নেয়ামতরাজির বরবাদি ও বঞ্চনার জন্য তাদের মোটেও কোন চিন্তা ও সতকর্তা নাই। এহেন দুরাবস্থা বস্তুতই দুঃখজনক ও বড়ই মারাত্মক। এসবের অনিবার্য ফলশ্রæতিতে আমরা এমন এক পর্যায়ে উপনীত হয়েছি যে, এসব তথ্যের বিষয়ে যদি মনে সন্দেহ পোষণ করি, তবে সত্যকে অস্বীকারকারী কাফেরে পরিণত হই, আর যদি বিশ্বাস করি, তবে ধোকাগ্রস্ত বোকা ও আহমকে পরিগণিত হই। চিন্তা করলে বাস্তবিকই এ কথা সাব্যস্ত হয় যে, আমাদের আমল-আখলাক সেরূপ নয়, যেরূপ কুরআনে কারীমের অনুসারীদের হওয়া উচিত ছিল- আমরা আল্লাহর কাছে কুফরীর দিকে ধাবিত হওয়া থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করি। অতি মহান ও পবিত্র সত্তা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। এতোসব বর্ণনার পরও যদি কেউ গাফলত ও উদাসীনতার দরুন সতর্ক-সাবধান হওয়া এবং একীন ও ঈমানী বিশ্বাসে দীপ্ত হওয়া থেকে বঞ্চিত হয়ে থকে, তবে সেটা তারই কসূর; তারই অপরাধ।
বিশ্বনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘কুরআনে কারীমের আয়াতের সংখ্যা পরিমাণ হবে জান্নাতের সিঁড়ি। আর কুরআনে কারীমের পাঠককে বলা হবে, ‘তুমি যতটুকু কুরআন পড়েছো ততটুকু সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠো। যে ব্যক্তি সম্পূর্ণ কুরআনে কারীম পড়েছে সে আখেরাতে জান্নাতের সর্বশেষ সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে যাবে। যে ব্যক্তি কুরআনে কারীমের কিছু অংশ পড়েছে সে সম পরিমাণ উপরে উঠবে। আর তার কুরআনে কারীম পড়ার সীমানা যেখানে শেষ হবে সেখানে তার সাওয়াবের সীমানাও শেষ হবে। সুবহানাল্লাহ

Leave a Reply

Your email address will not be published.