তাবলীগ ও আহকামে তাবলীগ

তাবলীগ ও আহকামে তাবলীগ

ইসলাম প্রতিদিন সংস্কৃতি

তাবলীগ

আহকামে তাবলীগ

শরীয়তের প্রতিটি বিষয়ের নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম-পদ্ধতি, আহকাম ও আদব রয়েছে। সেগুলোর অনুসরণ করলে কাজটি পরিপূর্ণ হয়, -এর ফায়দা জাহের ও ফলপ্রসূ হয়। ইবাদত হিসেবে গণ্য হয় এবং আল্লাহ তা‘আলার নিকট মকবুল হয়। অনুরূপ দাওয়াত ও তাবলীগের কিছু আহকাম ও আদব রয়েছে। নিম্নে তার কয়েকটি উল্লেখ করা হলো।

১. যে বিষয় সম্পর্কে তবলীগ করবে, সে সম্পর্কে শরীয়তের পূর্ণজ্ঞান থাকা দরকার।

২. নেক কাজের আদেশ করার জন্য প্রথম শর্ত ইখলাস। অর্থাৎ শুধু আল্লাহর ওয়াস্তে নসীহত করবে, নিজের নফসকে খুশি করা অথবা অন্যকে দেখানোর জন্য নসীহত করবে না। আর এটার মাপকাঠি হলো, উপদেশ দান করার সময়ও উপদেশদাতা শ্রোতাণ্ডলীকে নিজ থেকে অধিক ভালো মনে করবে। দ্বীনি কাজে যাদের লোক দেখানো মনোভাব থাকে তাদের ব্যাপারে হাদীস শরীফে কঠিন সর্তক বাণী এসেছে। একটি হাদীসে বর্ণিত আছে, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘‘কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম যে সমস্ত লোকের ফায়সালা শুনানো হবে, তাদের মধ্যে একজন ঐ শহীদ হবে। যাকে ডেকে আল্লাহ তা’আলা স্বীয় ঐ সমস্ত  নেয়ামত স্মরণ করাবেন যা তাকে দান করেছেন। নেয়ামত সমূহ দেখে সে চিনিতে পারবে এবং স্বীকার করবে। তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে, এ সকল নেয়ামত সমূহ দ্বারা তুমি কি করেছ? সে উত্তর দিবে, তোমার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে জিহাদ করেছি; এমনকি শহীদ হয়ে গেছি। ইরশাদ হবে- তুমি মিথ্যা বলছ; লোকে তোমাকে বীরপুরুষ বলবে এই জন্যই সবকিছু করেছ। সুতরাং তা তো বলা হয়েছে এবং যে উদ্দেশ্যে জিহাদ করেছিলে তা হাসিল হয়ে গেছে। অতঃপর তাকে হুকুম শুনানো হবে এবং অধঃমুখী করে টেনে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। দ্বিতীয় ঐ আলেমেও হবে যে নিজে ইলেম শিখেছে, অন্যকে শিখিয়েছে এবং কুরআন পাক অর্জন করেছে। তাকে ডেকে দুনিয়াতে যে সমস্ত নেয়ামত দেওয়া হয়েছিলো স্মরণ করানো হবে। সে স্বীকার করবে। অতঃপর তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে- এইসব নেয়ামত পেয়ে তুমি কি কি কাজ করেছ? সে আরজ করবে, তোমাকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে নিজে ইলম শিখেছি, অন্যকে শিখিয়েছি এবং তোমার সন্তুষ্টির জন্য কুরআনে কারীম হাসিল করেছি। উত্তর হবে- তুমি মিথ্যা বলছ; বরং লোকে তোমাকে আলেম বলবে এই জন্য ইলম শিখেছ এবং লোকে তোমাকে ক্বারী বলবে এই জন্য কুরআন পড়েছ। আর তা বলা হয়েছে। (অর্থাৎ শেখা ও শেখানো যা উদ্দেশ্য ছিলো তা পূর্ণ হয়ে গেছে) অতঃপর তাকেও হুকুম শুনানো হবে এবং অধঃমুখী করে টেনে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। তৃতীয় ঐ ধনী ব্যক্তিও হবে যাকে আল্লাহ তা‘আলা রিযিকের প্রশস্ততা প্রদান করেছিলেন এবং সবরকম ধন-সম্পদ দিয়েছেন। তাকে ডাকা হবে এবং নেয়ামতসমূহ স্মরণ করানো হবে এবং স্বীকারোক্তির পর জিজ্ঞাসা করা হবে- এই সমস্ত ধন-সম্পদ পেয়ে তুমি কি আমল করেছ? সে উত্তর করিবে, এমন কোনো উত্তম স্থান নেই যেখানে খরচ করলে আপনার সন্তুষ্টি লাভ হয় আর আমি খরচ করিনি। ইরশাদ হবে- তুমি মিথ্যা বলছ; বরং লোকে তোমাকে দানশীল বলবে এই জন্য তুমি এইসব করেছ। সুতরাং তা বলা হয়েছে অতঃপর তাকেও হুকুম অনুযায়ী জাহান্নামে টেনে ফেলে দেওয়া হবে। -মিশকাত, সহীহ মুসলিম

৩. তাবলীগ করার সময় একমাত্র দ্বীনী খেদমতকেই মুখ্য উদ্দেশ্য মনে করবে, সুফলপ্রাপ্তির প্রতি লক্ষ্য করবে না। কারণ এটা গায়রে ইখতিয়ারী জিনিস। মনে মনে এই অনুভূতি লালন করবে- নিজের ইসলাহ এবং দ্বীনের খেদমতের জন্য ওয়াজ করছি। যশ ও খ্যাতির নিয়তে নয়।

৪. ওয়াজ শুধু তাবলীগের উদ্দেশ্যে হওয়া উচিত। উপদেশদানকারী হাদিয়া-তোহফা গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকবে। ওয়াজ যখন পার্থিব উদ্দেশ্যমুক্ত হবে, তখন যাদেরকে সম্বোধন করা হবে, তাদের অন্তরে নসীহত বড় প্রভাব সৃষ্টি করবে। ওয়াজ করে চুক্তিভিত্তিক বিনিময় নেয়া অত্যন্ত গর্হিত কাজ।

৫. মজলিসে কোনো ব্যক্তিকে খাসভাবে সংশোধন করা উচিত নয়। কেননা এতে অন্যকে লজ্জিত করা হয়। আর এই লজ্জা পাওয়ার প্রতিক্রিয়াস্বরূপ নসীহতকারীর প্রতি বিদ্বেষের উদ্রেক হয়; বরং কোনো কোনো সময় ওই মন্দ কাজ বর্জন করার পরিবর্তে সেই কাজে আরো পরিপক্ক হয়ে যায়। কেননা সে মনে করে, আমার মান-সম্মান তো নষ্ট হয়েই গেছে, তাহলে এই কাজ আর কেন ছাড়বো? সুতরাং উত্তম পন্থা হলো, হয় নিজে তাকে নির্জনে ডেকে বুঝিয়ে দিবে কিংবা এমন কোনো লোক দ্বারা বলাবে, যে তাকে সংশোধন করতে পারে, কিন্তু তার শত্রæর দ্বারা বলাবে না। কেননা শত্রæর দ্বারা বলানোতে সংশোধন তো হবেই না; বরং তাকে অপদস্থ করা হবে।

৬. নরম ব্যবহার এবং স্নেহ-মুহাব্বতের সঙ্গে নেক কাজের আদেশ করবে; এতেও যদি বিরোধিতা হয়, তবে ধৈর্যধারণ করবে। আর যদি ধৈর্যধারণের ক্ষমতা না থাকে, তাহলে ব্যক্তি বিশেষকে সম্বোধন করবে না। শুধু ব্যাপকভাবে নসীহত করা যথেষ্ট মনে করবে। নরমভাবে নসীহত করবে, কোনো লোককে তুচ্ছ মনে করে কটাক্ষ করবে না।

৭. হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বয়ানের শুরুতে আল্লাহ তা‘আলার হামদ ও ছানা পড়ে কালেমায়ে শাহাদাত পাঠ করতেন এবং তিনি ইরশাদ ফরমান, কালেমায়ে শাহাদত ছাড়া বয়ান হাতকাটা মানুষের মতো। তার সঙ্গে কুরআনে কারীমের আয়াত তিলাওয়াত করতেন। -মুসলিম শরীফ, যাদুল মাআদ

৮. হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গুরুত্বপূর্ণ কথাগুলো তিন-তিনবার বলতেন।

৯. আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন-

فَاِذَا فَرَغْتَ فَانْصَبْ -, وَاِلٰى رَبِّكَ فَارْغَبْ

 অর্থ : “অতএব যখন আপনি অবসর হবেন একান্তে ইবাদত করুন এবং আপনার প্রতিপালকের প্রতি মনোনিবেশ করুন।” -সূরা ইনশিরাহ : ৭-৮

হযরতওয়ালা মুহিউস সুন্নাহ হারদূঈ রহ. বলেন, ওয়ায়েয, মুবাল্লিগগণের মামূলাত এবং আল্লাহর সঙ্গে ধ্যানমগ্নতায় কিছু সময় কাটানোরও খুব বেশি ইহতিমাম করা উচিত।

হযরত আরেফে রূমী রহ. বলেন, যদি কূপ থেকে অনবরত পানি উঠানো হয় তাহলে দেখা যাবে যে পানির পরিবর্তে কাদা আসছে। যেমন- মা শিশু বাচ্চাকে অনবরত দুধ পান করালে এক সময় দুধ নিঃশেষে রক্ত আসবে। সুতরাং লোক সমাবেশে নূর পৌঁছানো যেমন জরুরী, নির্জনতায় আল্লাহর যিকিরের মাধ্যমে কলবে নূর হাসিল করাও তেমন জরুরী।

হযরত মাওলানা ইলিয়াস দেহলভী রহ. ইরশাদ করতেন, মুবাল্লিগেদ্বীন প্রকাশ্য অবস্থায় মানুষের সঙ্গে মেলামেশার দ্বারা অন্তরে যে ময়লা পড়ে সেটাকে নির্জনতার নূর তথা একাকীত্বের নাওয়াফেল, যিকির-ফিকির এবং কুরআন তিলাওয়াতের দ্বারা এবং আহলুল্লাহগণের খিদমতে উপস্থিতির দ্বারা ধৌত করা উচিত।

১০. দ্বীনের দাঈদের আরেকটি বিষয় লক্ষ্য রাখা আবশ্যক। তাহলো, অন্যকে যে বিষয়ে দাওয়াত দিবে নিজেও তার উপর আমল করবে। যে মুনকারটি ইসলাহ করবে নিজেও তার থেকে বেঁচে থাকবে। এর দ্বারা প্রতীয়মান হয়, অন্যের সংশোধনের পাশাপাশি নিজেকেও গড়ে তোলার চিন্তা করতে হবে।

১১. মুহিউস সুন্নাহ হযরতওয়ালা হারদূঈ রহ. ফরমান, প্রত্যেক দ্বীনী মেহনতকারী ব্যক্তির জন্য সুন্নাতের অনুসরণকারী কোনো বুর্যূগকে আপন শাইখ বানানো জরুরী। যারা নিজেদেরকে আল্লাহওয়ালাদের থেকে অমুখাপেক্ষী ও পরওয়াহীন মনে করে তারা হয়তো مَغْضُوْب বা আল্লাহর গযবের শিকার হয় অথবা ضَآلِّيْنَ তথা পথভ্রষ্ট হয়। কেননা সূরা ফাতিহায় তিন ধরনের মানুষের রাস্তাই বর্ণনা করা হয়েছে। مُنْعَمْ عَلَيْهِمْ তথা নেয়ামতপ্রাপ্তদের রাস্তা, مَغْضُوْبِ عَلَيْهِمْ তথা গযবপ্রাপ্তদের রাস্তা, এবং ضَآلِّيْنَ তথা পথভ্রষ্টদের রাস্তা। এজন্য আল্লাহওয়ালাদের থেকে নিজেকে অমুখাপেক্ষী মনে করা অত্যন্ত ভয়াবহ ব্যাপার। তিনি আরও বলেন, প্রত্যেক ফেৎনার জনকের ব্যাপারে যদি গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হয়, তাহলে এটাই জানা যাবে যে, সে ব্যক্তি কোনো দ্বীনী মুরুব্বীর তত্ত্বাবধানে থাকেনি। যখন মানুষ লাগামহীন হয়, কেউই তার মুরুব্বী হিসেবে না থাকে তখন সে বিগড়ে যায়। পদমর্যাদা আর মালের ফেৎনায় জড়িয়ে পড়ে।

১২. দশ মিনিট ওয়াজের এ‘লান হলে দশ মিনিটেই ওয়াজ সমাপ্ত করা উচিত। কেননা এরূপ ঘোষণা ওয়াদার অর্ন্তভুক্ত। একই মাহফিলে অন্যান্য বক্তা থাকতে পারে। তার জন্য নির্ধারিত সময়ে তাকেই সুযোগ দেয়া উচিত, অন্যথায় এটা হক নষ্ট করার শামিল হবে।

১৩. ওয়াজের সময়ে নিজের ইসলাহের নিয়ত করা অত্যন্ত উপকারী। কেননা ওয়ায়েয নিজেও ইসলাহের মুখাপেক্ষী। তাছাড়া নিজের ইসলাহ কামনাকারী ওয়ায়েযের দ্বারা ফায়দাও অধিক হয়ে থাকে।

১৪. ওয়ায়েজীনে কিরাম শ্রোতাবৃন্দকে যেমন নেক আমলের প্রতি উদ্বুদ্ধ করবে তেমনি মশকের মাধ্যমে উযূ, নামায, আযান, ইকামত ঠিক করাবে। পাশাপাশি অর্জিত ইবাদতের নূর হেফাযতের জন্য গুনাহ’র ক্ষতি এবং গুনাহ’র পরিচিতিও তুলে ধরবে। সঙ্গে সঙ্গে দরবারে ইলাহীতে নিজের ইসলাহ ও উম্মতের ইসলাহের জন্য দু‘আ-রোনাজারি করবে।

১৫. তাবলীগের কাজে সামান্যতম মেহনত করতে পারাও আল্লাহ তা‘আলার খাস তাওফীক, তাই মহান আল্লাহর দরবারে শুকর আদায়ের ব্যাপারেও সর্বদা সচেতন থাকবে।

১৬. দাওয়াতের কাজের দ্বারা আল্লাহর রেযামন্দী, দ্বীনের প্রচার, সমস্ত আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাতু ওয়াসসালামের সুন্নাত। বিশেষ করে সাইয়িদুল আম্বিয়া হযরত মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইত্তিবা ও অনুসরণের নিয়ত করবে। দ্বীনের প্রতিটি হক লাইনের মেহনতে পরস্পরকে সহযোগিতা করা নেহায়েত আবশ্যক। তা‘লীম, তাবলীগ, তাযকিয়া এক ও অভিন্ন তা সকলের জন্য জরুরী।

১৭. দ্বীনী ইলম শিক্ষাদান বা দ্বীন প্রচার কাজে পারিশ্রমিক গ্রহণ করা ঠিক নয়। তাই পূর্ববতী ইমামগণ একে নাজায়েয বলেছেন। কিন্তু পরবর্তীকালের ফিকাহবিদগণ প্রয়োজনের তাকিদে একে বৈধ সাব্যস্ত করেছেন। -মাসায়েলে মা‘আরেফুল কুরআন

১৮. ওয়াজের দ্বারা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টির নিয়ত করবে। সুর দিয়ে ওয়াজ করে মানুষকে আকর্ষণ করার চেষ্টা করবে না। কেননা যারা মাখলুককে খুশি করার নিয়তে ওয়াজ করে তাদের অন্তরে হুব্বে জাহ হুব্বে মাল তথা প্রসিদ্ধি ও সম্পদ কামনার রোগ সৃষ্টি হয়। যার ইসলাহ করা অত্যন্ত জরুরী। কেননা এ ধরনের দ্বীনী খেদমত দ্বারা সওয়াব তো পাবেই না; বরং তা জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হবে।

১৯. মুবাল্লিগে দ্বীন তথা দ্বীনের দাঈদের জন্য নিজেকে প্রচলিত রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থেকে এ খেদমত আঞ্জাম দিতে হবে।

২০. অনেক বক্তা চা পানের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে লোকদেরকে মীলাদ-দুরূদে লাগিয়ে সে সুযোগে চা পান করেন। এটা অশোভনীয় কাজ। দ্বীনী উদ্দেশ্যহীন এ-ধরনের ক্ষেত্রে দুরূদ পড়াও নিষেধ।

তালীম, তাবলীগ ও তাযকিয়া প্রত্যেকটিই গুরুত্বপূর্ণ

হযরতওয়ালা মুহিউসসুন্নাহ শাহ আবরারুল হক হারদুঈ রহ. বলেন, এক প্রকারের জিনিসের মধ্যে পরস্পরে শ্রেষ্ঠত্বের ব্যাপার থাকতে পারে। দুই প্রকারের মধ্যে নয়। যদি কেউ প্রশ্ন করেন যে, চোখ ভাল, নাকি কান ভাল, নাকি জিহ্বা ভাল? এ প্রশ্নের কী উত্তর দেয়া হবে? এগুলোর মধ্যে তো প্রত্যেকটিই জরুরী। এদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ কোনটি, সে প্রশ্ন করাটাই ভুল। কেননা এগুলো ভিন্ন ভিন্ন অঙ্গ। অবশ্য এভাবে বলা যেতে পারে যে, দুই চোখের মধ্যে যে চোখ বেশি দেখে সেটা উত্তম। দুই কানের মধ্যে যে কানটি বেশি শোনে সেটা উত্তম।

এই উদাহরণের মাধ্যমে এখন এ ব্যাপারটি সুস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে যে, তা‘লীম, তাবলীগ ও তাযকিয়ার (আত্মশুদ্ধি) মধ্যে কোনটির প্রয়োজনীয়তা বেশি? এ প্রশ্নটি সমীচীন নয়। কেননা, এগুলোর মধ্যে একটি অন্যটির পরিপূরক। আর ভিন্ন ভিন্ন প্রকারে শ্রেষ্ঠত্বের প্রশ্ন আসে না। অতএব প্রত্যেকটিরই প্রয়োজন আছে। তা‘লীমও জরুরী। তাবলীগও জরুরী। অবশ্য আত্মশুদ্ধির গুরুত্ব তা‘লীম ও তাবলীগের চেয়ে বেশি। কেননা, আত্মশুদ্ধি ছাড়া তা‘লীম ও তাবলীগ গ্রহণযোগ্য নয়। আত্মশুদ্ধির মেহনতের মারকায হচ্ছে খাঁটি আল্লাহওয়ালাদের খানকাসমূহ। আত্মশুদ্ধির মাধ্যমেই অন্তরে তাকওয়া ও ইখলাস সৃষ্টি হয় এবং অন্তরের বদ-খাসলতও দূর হয়। আর ইখলাস ছাড়া সমস্ত আমল ও ইবাদত বেকার।

উপরোক্ত সকল বিষয়ের উপর আমল করার দ্বারাই কুরআন-সুন্নাতের অনুসরণ ও অনুকরণের সৌভাগ্য লাভ হয়। এগুলোর কোনো একটিকে গ্রহণ করে অপরটি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়াটা এমনই ধ্বংসাত্মক, যেমন কেউ কান হেফাজত করলো কিন্তু চক্ষুকে ধ্বংস করে দিলো। ফিকাহকে তাসাওউফের কিংবা তাসাওউফকে ফিকাহর পরিপন্থী মনে করা, কানকে চোখের পরিপন্থী মনে করার নামান্তর। যে সকল লোককে আল্লাহ তা‘আলা কুরআন-হাদীসের এ সকল বিষয়ের উপর এক সাথে আমল করার তাওফীক দিয়েছেন, কেবল তারাই এ সকল বিষয়ের হাকীকত অনুধাবন করে থাকেন।

মুবাল্লিগ

মুবাল্লিগে দ্বীনের জন্য তাযকিয়াতুন্নফস জরুরী
প্রতিটি মুসলমানকে দ্বীনের মুবাল্লীগ হতে হবে তবে শর্ত হলো সে যে বিষয়ে মেহনত করবে সে বিষয়ে পুর্ণ ইলম থাকতে হবে। দ্বীনের দাঈকে তা‘লীম, তাবলীগ ও তাযকিয়ার মাধ্যমে নিজকে খাঁটি মুবাল্লিগ হিসেবে তৈরি করতে পারলে তবেই নিজেরও ফায়দা হবে এবং উম্মতেরও ফায়দা পৌঁছবে।

তাযকিয়া এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যে, হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম আল্লাহর ঘর বাইতুল্লাহ নির্মাণ শেষে যে উদ্দেশ্যে একজন রাসূল প্রেরণের জন্য দরখাস্ত করেছিলেন তা হলো-

رَبَّنَا وَابْعَثْ فِيْهِمْ رَسُوْلًا مِّنْهُمْ يَتْلُوْا عَلَيْهِمْ اٰيَاتِكَ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَيُزَكِّيْهِمْ

অর্থ : “হে আমাদের প্রভু! আপনি তাদের মধ্য হতে তাদের নিকট একজন রাসূল প্রেরণ করবেন। তিনি তাদের সম্মুখে আপনার আয়াতসমূহ পাঠ করবেন এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দিবেন এবং তাদের তাযকিয়া করবেন।” -সূরা বাকারা : ১২৯

এখানে দু‘আকারী তাযকিয়াকে চতুর্থ উদ্দেশ্য রূপে উল্লেখ করেছেন। হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের দু‘আর ফলশ্রুতিতে আল্লাহ তা‘আলার আখেরী নবী হযরত মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রেরণ করত: এই চার উদ্দেশ্যের কথাই বলেছেন। কিন্তু দু‘আ কবুলকারী আল্লাহ তা‘আলা বর্ণনার ধারায় ব্যতিক্রম করে তাযকিয়াকে দ্বিতীয় পর্যায়ে রেখেছেন।

এতে প্রতীয়মান হয়, তাযকিয়া এত গুরুত্বপূর্ণ যে, একে চার নম্বরে না রেখে দুই নম্বরে রাখা হয়েছে। ইরশাদ করেন,

هُوَ الَّذِيْ بَعَثَ فِى الْاُمِّيِّيْنَ رَسُوْلًا مِّنْهِمْ يَتْلُوْا عَلَيْهِمْ اٰيَاتِه وَيُزَكِّيْهِمْ

অর্থ : “তিনি ঐ সত্তা যিনি উম্মীদের মধ্যে একজন রাসূল প্রেরণ করলেন এ উদ্দেশ্যে যে, রাসূল তাদের সম্মুখে আয়াত তিলাওয়াত করবেন আর তাদের তাযকিয়া করবেন।” -সূরা জুমু‘আ : ২

এর দ্বারা তাযকিয়ার অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ হওয়া প্রমাণিত হয়।
তাযকিয়া ব্যতীত যেহেতু وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَ الْحِكْمَةَ (ইলম ও হিকমত) কোনো কাজেই আসে না, এ জন্য প্রথমে তাযকিয়ার কথা উল্লেখ করে এদিকে ইঙ্গিত করেছেন যে, হে দ্বীনের মুবাল্লিগগণ! গভীর মনোযোগ সহকারে শুন ও অনুধাবন কর, প্রথমে তোমাদেরকে তাযকিয়ার আগুনে দগ্ধ হয়ে পরিশুদ্ধ হতে হবে। অতঃপর তোমরা সফলকাম হবে। তোমাদের শ্রম সার্থক হবে। অন্যথায় ইখলাস না থাকার কারণে তোমরা দ্বীনের নামে দুনিয়া অর্জন করবে। নিজের সঙ্গে প্রতারণা করবে এবং আল্লাহর বান্দাদের সঙ্গেও প্রতারণা করবে। এজন্য তাযকিয়ার আলোচনা আগে করা হয়েছে।

আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন- قَدْ اَفْلَحَ مَنْ تَزَكّٰى
অর্থ : “নিশ্চয়ই সফলকাম হয়েছে ঐ ব্যক্তি যে তাযকিয়া করেছে।” -সূরা আল-আ‘লা : ১৪

হযরত মুহিউস সুন্নাহ হারদূঈ রহ. কে একজন প্রশ্ন করলেন, তা‘লীম (মাদরাসা) বেশি গুরুত্বপূর্ণ না তাবলীগ বেশি গুরুত্বপূর্ণ? জবাবে হযরত মুহিউস সুন্নাহ হারদূঈ রহ. বললেন, আচ্ছা বলুন তো শরীরের মধ্যে কান বেশি গুরুত্বপূর্ণ না কি চোখ? প্রশ্নকারী বললেন উভয়টিই সমান গুরুত্বপূর্ণ। কেননা একটির কাজ অপরটির দ্বারা হয় না। হযরতওয়ালা বললেন, তাহলে বুঝা গেল তাবলীগ ও তা‘লীম উভয়টিই জরুরী। উভয়টিই করতে হবে। তবে মনে রাখতে হবে তাবলীগ ও তা‘লীমের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে তাযকিয়া তথা আত্মশুদ্ধি। ইসলাহে নফস যদি না থাকে তাহলে রিয়ার কারণে তাবলীগ, তা‘লীম সবকিছুই বরবাদ হয়ে যাবে।
বহু পীর-মাশায়েখ ও দ্বীনের মুবাল্লিগ ধ্বংস হয় অন্তরে তিনটি রোগ পয়দা হওয়ার কারণে।

১. উযব (নিজেকে ভালো মনে করা বা নিজের প্রতি মুগ্ধতা)।
২. হুব্বে জাহ (প্রসিদ্ধি কামনা)।
৩. হুব্বে মাল (মালের মুহাব্বত)।

ইসলামের ইতিহাসে আছে, শাইখে বাগদাদ আল্লামা আবু আবদুল্লাহ উন্দুলুসী রহ. এর বেলায়েতকে আল্লাহ তা‘আলা বিলুপ্ত করে দিয়েছিলেন। উজব অর্থাৎ নিজেকে ভালো মনে করার কারণে। দীর্ঘদিন পর আল্লাহ তা‘আলা তাঁর তাওবা কবুল করে পুনরায় বেলায়েতকে ফিরিয়ে দেন।

অন্য একটি বর্ণনায় আছে, হযরত আহমদ কবীর রেফাঈ রহ. রওযা শরীফে সরাসরি হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাত মোবারকের চুম্বন ও যিয়ারত লাভ করার কারণে নিজের অন্তরে উজব আসতে পারে এ আশঙ্কায় মসজিদে নববীর দরজার সামনে শুয়ে পড়েন। নিজেকে পদদলিত করে বের হওয়ার জন্য মুসল্লীদেরকে আল্লাহর ওয়াস্তে অনুরোধ করেন। এভাবেই বুযুুর্গানে দ্বীন নিজেদের নফসের ইসলাহের ব্যাপারে সতর্ক থাকতেন। পরিশেষে হযরত মুহিউস সুন্নাহ হারদূঈ রহ. খাজা আযীযুল হাসান মজযূব রহ.-এর একটি পংক্তির উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন-

دل مين لگا كے ان كى لو * كردے جهاں ميں نشر ضو
شمع تو جل رهى هيں سو * ليكن بز ميں روشنى نہیں

“হৃদয়ে জাগাও ভালোবাসার জোয়ার, আলোকিত কর পৃথিবী।
প্রদীপ জ্বলছে অনেক কিন্তু মাহফিল আলোহীন।”

প্রথমে নিজেকে আলোকিত কর। অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলার মুহাব্বতের নূরে নিজের অন্তরকে নূরানী করে নাও, তারপর দুনিয়াব্যাপী তা ছড়িয়ে দাও। আজ আলেমসমাজ যদিও হেদায়েতের নূর বিলিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে রৌশনী নেই। আজ আমাদের ওয়াজ-নসীহতের কোনো প্রভাব নেই। তার জন্য আমরা নিজেদেরকে কতটুকু প্রস্তুত করে এ খেদমত আঞ্জাম দিচ্ছি- সে বিষয়ে আমাদের গভীরভাবে ভেবে দেখা দরকার।

মহিলাদের তাবলীগ
(মাসতুরাতের জন্য তাবলীগী জামাতে অংশগ্রহন)
নিজ ঘরের মধ্যে দ্বীন শিক্ষা করার সঠিক ব্যবস্থা থাকলে মহিলাদের তাবলীগ জামা‘আতে যাওয়া জরুরী নয়। ঘরের পুরুষদের থেকে মাসআলা-মাসায়িল শিখতে থাকবে এবং নিজ পরিবার তথা সন্তানাদি এবং মহল্লার মেয়েদেরকে বা তার সাথে দর্শনার্থী মহিলাদেরকে দ্বীনের দাওয়াত ও তা‘লীম দিতে থাকবে। ঘরে অবস্থান করেই দ্বীনের খেদমত আনজাম দিবে।

আর যদি দ্বীন-ধর্ম বিমুখ কোনো পরিবারের কোনো পুরুষ সদস্য যথা পিতা, ভাই, স্বামী প্রমুখ দ্বীনের দাওয়াত পেয়ে দ্বীনের প্রতি আকৃষ্ট হয়; কিন্তু নিজের ইলম না থাকার দরুন অন্যদেরকে দ্বীনদার বানাতে অক্ষম হয়, তাহলে সেক্ষেত্রে যেমন পুরুষ সদস্যদেরকে পুরুষদের তাবলীগের সাথে জুড়ে দিতে চেষ্টা করবে, তেমনি মহিলাদেরকেও নিজ যিম্মাদারীতে হাক্বানী উলামা কর্তৃক ইজাযত প্রাপ্ত বিশ্বস্ত আলেমা মহিলার তা‘লীম-তাবলীগের সাথে জড়াতে চেষ্টা করবে।

এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনে সফর করতে হলে স্বামী বা মাহরাম পুরুষ অবশ্যই সাথে থাকতে হবে এবং জামা‘আতটি তাবলীগী মারকাযের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকতে হবে। কোনো প্রকারের বেপর্দেগীর আশংকা যেন না থাকে। কোথাও যদি মহিলারা হাক্বানী উলামায়ে কিরাম বা মারকাযের অনুমতি ছাড়া নিজেরা স্বতন্ত্রভাবে তাবলীগী কর্মকাণ্ড চালাতে থাকে, তাহলে অভিভাবক ও মারকায কর্তৃপক্ষ দ্রæত হস্তক্ষেপ করে তা বন্ধ করে দিবে, নচেৎ দ্বীনের নামে বড় ধরনের ফিতনার দরজা উন্মুক্ত হবে এবং মহিলাগণ মারাত্মক গোমরাহীর মধ্যে লিপ্ত হয়ে দ্বীন ঈমান ধ্বংস করে ফেলবে। -ফাতহুল কাদীর-১/৩১৮


আরো নতুন নতুন ইসলামিক প্রবন্ধ পড়তে চোখ রাখুন আমাদের ওয়েব সাইট “রাহে সুন্নাত ব্লগ”

কুরআনুল কারিমের কথা পড়তে ক্লিক করুন

আরো জানতে ভিজিট করুন >>>>>>>> www.rahesunnat.com

Leave a Reply

Your email address will not be published.