নতুন প্রজন্মের নতুন অভিভাবক

নতুন প্রজন্মের নতুন অভিভাবক। কাজী মুজাহিদুল ইসলাম কাসেমী রহ.

আকাবির-আসলাফ জীবন কথা

নতুন প্রজন্মের নতুন অভিভাবক

নতুন প্রজন্মের নতুন অভিভাবক

মূল : মুফতী ইশতিয়াক আহমদ কাসেমী

নতুন প্রজন্মের নতুন অভিভাবক কাজী মুজাহিদুল ইসলাম কাসেমী রহ.

হযরত মাওলানা কাযী মুজাহিদুল ইসলাম কাসেমী রহ. ছিলেন সর্বগুণের অধিকারী সার্বজনীন একজন ব্যক্তিত্ব। তাঁর জীবন নামক গ্রন্থের প্রতিটি পাতা অত্যন্ত সমুজ্জ্বল এবং প্রতিটি অধ্যায় আলোচনার যোগ্য ও দরসের উপযোগী। কলম সৈনিকগণ তাঁর জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন। কিন্তু আমি আলোচনা করব তাঁর জীবনের একটি ব্যতিক্রমী দিক নিয়ে। আর তা হলো, কাযী সাহেবের মিশন দ্বারা নবীন ওলামায়ে কেরাম কী অনুপ্রেরণা পেয়েছেন?

কাযী সাহেবের উদ্যোগে আয়োজিত ‘আন্তঃ মাদারেস ফিকহী আলোচনা’ শীর্ষক একটি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করার সুযোগ আমার হয়েছে। উক্ত অনুষ্ঠান থেকে আমি কী অর্জন করেছি-সে লব্ধ অভিজ্ঞতা নিয়েই কিছু লেখার প্রয়াস চালাব ইনশাআল্লাহ।

তিনি হৃদয়কে মোহিত করেছেন এখনো দ্বিপ্রহর হয়নি। দারুল উলূম দেওবন্দের দারুল ইফতার সামনে প্রচণ্ড ভিড় লেগে আছে। ভিড় ক্রমেই বাড়ছে। আমি অতি কষ্টে ভিড় ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করে দেখি, সেখানে বসে আছেন ভাবগাম্ভীর্য ও ব্যক্তিত্বপূর্ণ একজন আলেম। চোখে চশমা পরা। গোল জালি টুপি গোটা মাথাকে ঢেকে নিয়েছে। তিনি হেলান দিয়ে আরামে বসে আছেন। দারুল ইফতার আসাতিযায়ে কেরাম ও অন্যান্য মুফতীগণ তাঁকে ঘিরে এমনভাবে বসে আছেন, যেমন কোন আকাবিরের সামনে বসা হয়। মজলিসটি একেবারে নীরবও ছিল না। এই মহান ব্যক্তিত্ব দারুল ইফতার আসাতিযায়ে কেরামের কাছ থেকে বিভিন্ন বিষয়ে জিজ্ঞেস করছেন, যেমন কোন মুফতীর কাছে ফতোয়া জানার জন্য জিজ্ঞেস করা হয়।

আমি বিস্ময়ের সঙ্গে সেখানে উপবিষ্ট ড. মাওলানা উবায়দুর রহমান কাসেমীকে জিজ্ঞেস করলাম, ইনি কে? তিনি জবাব দিলেন আরে। ইনি তো হযরত মাওলানা কাযী মুজাহিদুল ইসলাম কাসেমী দা. বা.। এরপর আমি কাষী সাহেবের দিকে চাতক পাখির মতো তাকিয়ে রইলাম এবং তাঁর খুব নিকটে পৌছার চেষ্টা করলাম। কাষী সাহেব তখন একটি মাসআলা জিজ্ঞেস করলেন, ‘যদি কোন সন্তান মায়ের পেটে থাকে এবং আধুনিক প্রযুক্তি আলট্রাসনোগ্রাম ইত্যাদির মাধ্যমে ডাক্তার বলে দেন, এই সন্তান প্রতিবন্ধী হবে এবং তার মানসিক ভারসাম্য ঠিক থাকবে না, তাহলে এমন গর্ভ বিনষ্ট করা জায়েয হবে কি-না?’ দারুল ইফতার সদর হযরত মুফতী হাবীবুর রহমান খায়রাবাদী সাহেব বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করতে লাগলেন। কিন্তু ফিকাহ একাডেমী ইন্ডিয়ার বর্তমান সদর মুফতী যফীরুদ্দীন সাহেব বললেন, এমন গর্ভ বিনষ্ট করা জায়েয হবে না। কারণ সন্তানের দেহে প্রাণ চলে আসার পর আর গর্ভ বিনষ্ট করা জায়েয নেই।

হযরত মাওলানা কাযী মুজাহিদুল ইসলাম কাসেমী রহ. এর সাথে আমার এটাই ছিল প্রথম সাক্ষাত। এরপর থেকে তো আমি দেওবন্দে তাঁর ছায়া হয়ে গেলাম। মজলিস শেষ হলো। আমি তাঁর সাথে সালাম মুসাফাহা করলাম। তিনি আমার নাম, বাড়ী কোথায়, কী পড়ি ইত্যাদি জিজ্ঞেস করলেন। যখন জানতে পারলেন, আমার বাড়ী দরভাঙ্গা, তখন তিনি ভীষণ খুশি হলেন।

কাজী সাহেব রহ. এর অভ্যাস ছিল, কোন তালেবে ইলম পেলেই কিছু না কিছু অবশ্যই জিজ্ঞেস করতেন। একবার রাস্তায় চলতে চলতে এক তালিবে ইলমের সাথে তাঁর সাক্ষাত হলো। তালিবে ইলমের নামটা আমার এই মুহূর্তে স্মরণে আসছে না। তালিবে ইলমকে জিজ্ঞেস করলেন, কী পড়? সে জবাব দিল, তাকমীলুল হাদীস পড়ি। কাযী সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, উসূলে ফিকাহর কোন কিতাব পড়? সে জবাব দিল, আল আশবাহ ওয়ান নাযায়ির। এরপর জিজ্ঞেস করলেন, এটি উসূলে ফিকাহর কিতাব, না কাওয়ায়েদে ফিকাহর কিতাব? আর উসূল ফিকাহ ও কাওয়ায়েদে ফিকাহর মধ্যে পার্থক্য কী? তালেবে ইলম চুপ রইল, কোন উত্তর দিতে পারল না। এরপর আরেকজনকে জিজ্ঞেস করলেন। এভাবে রাস্তা চলতে লাগলেন।

কাজী সাহেব সম্পর্কে আমি অনেক আগে থেকেই শুনে আসছি। কিন্তু প্রথমবারের এই সাক্ষাত আমার হৃদয়ে একটি দীর্ঘস্থায়ী ও সুদূরপ্রসারী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করল।

নতুন প্রজন্মের ওলামায়ে কেরামের প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম কাযী সাহেবের প্রধান বিষয় ছিল ইলম ও তাহকীক, ফিকাহ ও ফতোয়া এবং কাযা বা বিচারসংক্রাস্ত। তাঁর মিশনের অন্যতম দিক ছিল নবীন আলেমদের মধ্যে ইলমী ও ফিকহী দূরদর্শিতা সৃষ্টি করা। তারা যেন সরাসরি কুরআন-সুন্নাহ থেকে মাসায়েল বের করতে পারে, যুগের নিত্যনতুন চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করতে পারে, উম্মাহর নতুন নতুন সমস্যা ও সংকটের শরয়ী সমাধান পেশ করতে পারে এবং তাদের মধ্যে যেন গবেষণা ও অনুসন্ধিৎসার চেতনা বিকশিত হয়। এক কথায় নবীন ওলামায়ে কেরামকে আধুনিক যুগের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার যোগ্য করে গড়ে তোলার জন্য তিনি সর্বাত্মক প্রয়াস চালাতেন। তাঁর এই মিশনকে তিনি বাস্তবে রূপায়নের জন্য ফিকাহ একাডেমীর গোড়াপত্তন করেন। একাডেমীর অন্যান্য কার্যক্রমের পাশাপাশি তিনি মাদারেসে ইসলামিয়ার ছাত্রদের মধ্যে লেখালেখির চেতনা সৃষ্টি করার জন্য বিভিন্ন সময়ে ‘আন্তঃ মাদারেস ফিকহী আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করতেন। বিভিন্ন বিষয়ে ছাত্রদের কাছ থেকে প্রবন্ধ আহবান করতেন। এই ধারাবাহিকতায় একবার একাডেমীর উদ্যোগে ছাত্রদের কাছ থেকে ‘ওয়াকফ’ বিষয়ে প্রবন্ধ আহবান করা হয় এবং এতে বিজয়ীদের মধ্যে মূল্যবান পুরস্কার বিরতণ করা হবে মর্মে ঘোষণা দেওয়া হয়। প্রবন্ধের আলোচ্য বিষয় ছিল তিনটি- ০১. কুরআন-সুন্নাহ’য় ওয়াক্ফ ০২. ওয়াক্ফের পরিবর্তন ০৩. ওয়াকফের লালন’। আলোচ্য তিনটি শিরোনামে প্রবন্ধ লেখার জন্য ফিকাহ একাডেমী থেকে বিভিন্ন মাদরাসায় পোস্টার পাঠানো হয়।

কাজী সাহেবের তরবিয়ত ও প্রশিক্ষণের ধরণই ছিল ভিন্ন। তাই একাডেমীর পক্ষ থেকে পোস্টারটি এমনভাবে তৈরি করা হয় যে, পোস্টারে উল্লিখিত প্রতিটি শিরোনামের অধীনে সাব-শিরোনামও উল্লেখ করে দেওয়া হয়। একজন নতুন তালিবে ইলমও যদি সেই পোস্টারটি সামনে রেখে প্রবন্ধ লেখা শুরু করে, তাহলেও সে একটি গ্রহণযোগ্য প্রবন্ধ লিখতে সক্ষম হবে। পোস্টারটি দেখেই এমন অনুভব হয় যে, কোন নবীন তালিবে ইলম তার অতি দয়াশীল উস্তাদের কাছ থেকে এ বিষয়ে প্রবন্ধ লেখার জন্য একটি গাইডলাইন পেয়েছে। এই পোস্টারটিকে সামনে রেখে প্রবন্ধ লিখলেই যথেষ্ট। এরপর প্রবন্ধ লেখার সময় টীকা-টিপ্পনী, লেখার ধরন ও পদ্ধতি এবং উৎস লেখার ক্ষেত্রে কোন কোন বিষয় সুস্পষ্ট হওয়া জরুরী ইত্যাদিও চিহ্নিত করে দেওয়া হয়েছিল। যেমন লেখক, প্রকাশনা সংস্থা, প্রকাশের তারিখ ইত্যাদি। উর্দু কিংবা আরবীর যে কোন একটি ভাষায় প্রবন্ধ লিখতে হবে।

আমার প্রবন্ধ

আমি আমার প্রবন্ধের বিষয় নির্ধারণ করলাম ‘ওয়াকফের পরিবর্তন’। ভাষা নির্ধারণ করলাম আরবী। কারণ আমার ভাল করেই জানা ছিল, ফিকাহ শাস্ত্রের বেশির ভাগ উৎস আরবী ভাষায়। এই ভিত্তিতে উর্দুর তুলনায় আরবীতে প্রবন্ধ লেখা সহজ হবে। সংক্ষেপে অনেক কথা এসে যাবে। পনের থেকে বিশ পৃষ্ঠার মধ্যে প্রবন্ধ লিখতে হবে এবং নিচে গোটা প্রবন্ধের একটি সারসংক্ষেপও লিখে দিতে হবে। আমি পনের পৃষ্ঠার একটি প্রবন্ধ এবং তিন পৃষ্ঠার একটি সারসংক্ষেপ লিখে ফিকাহ একাডেমীতে পাঠিয়ে দিলাম । পুরস্কার বিতরণী ও আলোচনা অনুষ্ঠান

প্রবন্ধ পাঠানোর প্রায় দীর্ঘ দুই বছর পর এর ওপর আলোচনার জন্য সেমিনারের আয়োজন করা হয়। সেমিনারটি অনুষ্ঠিত হয় দারুল উলূম ওয়াকফ দেওবন্দের বিশাল হলে। এই সেমিনারের গুরুত্বের ভিত্তিতে ছাত্রদের উৎসাহ যোগানোর জন্য কাযী সাহেব নিজে ফিকাহ একাডেমীর কর্মকর্তা-কর্মচারী ও কয়েকজন আধুনিক শিক্ষিত ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়ে হাজির হলে গেলেন। জানতে পারলাম, প্রবন্ধের প্রতিটি শিরোনামে ছাত্রদের মাঝে নতুন ধরনের আলোচনা-পর্যালোচনা অনুষ্ঠিত হবে। সভাপতির আসনে কাজী সাহেব যথারীতি আলোচনা শুরু হয়ে গেল। অনুষ্ঠানের প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করলেন কাযী সাহেব। অনুষ্ঠান শেষে সভাপতির ভাষণ দেবার জন্য কাযী সাহেবকে আহবান করা হলে তিনি স্টেজে আগমন করলেন। সভাপতির ভাষণে তিনি ফিকাহর ব্যাপকতা ও সার্বজনীনতা’ বিষয়ে আলোচনা শুরু করলেন। আমি এর পূর্বেও ফিকাহর ওপর আলোচনা শুনেছি এবং আমার সীমিত মুতালাআর আলোকে অসংখ্য ফিকাহর কিতাবে ফিকাহর বিভিন্ন সংজ্ঞা পড়েছি। ইমাম আবু হানিফা রহ. ফিকহের যে সংজ্ঞা দিয়েছেন, معرفه النفس مالها وما عليها সংজ্ঞাটিও যথেষ্ট বোঝার চেষ্টা করেছি। কিন্তু কাযী সাহেব রহ. ইমাম আবু হানিফা রহ. এর সংজ্ঞার সূত্র ধরে ফিকাহর ব্যাপকতা ও সার্বজনীনতা এবং ফকীহ’র দায়িত্ব ও যিম্মাদারী সম্পর্কে এত সুবিস্তারিত আলোচনা করলেন, যা আমি ইতোপূর্বে না কখনো শুনেছি আর না কোন কিতাবে পড়েছি।

কাজী সাহেবের আলোচনা শুনে আমি এক অন্য জগতে হারিয়ে গেলাম। পূর্বেই আমি কাযী সাহেবের আলোচনার প্রশংসা শুনেছি। কিন্তু সেদিন বাস্তবে তাঁর আলোচনা শুনে মনে হলো, আসলেই কাযী সাহেব বাগীতা ও আলোচনায় নিজেই নিজের দৃষ্টান্ত। সেদিনের আলোচনায় দারুল উলূমের গোটা হল কানায় কানায় ভরে উঠেছিল। কাজী সাহেবের আলোচনা চলছিল প্রায় চল্লিশ পঞ্চাশ মিনিট ধরে। গোটা অনুষ্ঠানে পিনপতন নীরবতা বিরাজ করছিল। বয়ানের ভাষা ছিল অত্যন্ত সহজ, সরল ও বোধগম্য। যতক্ষণ তিনি আলোচনা করছিলেন ততক্ষণ গোটা সমাবেশ তাঁর ছিল। আলোচনার মাঝে ফিকাহ একাডেমীর প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট এবং লক্ষ্য-উদ্দেশ্যও বর্ণনা করলেন। আন্তঃ মাদারেস ফিকহী আলোচনায় অংশগ্রহণকারী ছাত্রদের তিনি ধন্যবাদ জানালেন এবং তাদেরকে এ ময়দানে দ্বীপ্ত সাহসের সাথে এগিয়ে যাবার প্রেরণা ও উৎসাহ যোগালেন।

বয়ানের শেষে যখন কাজী সাহেব ঘোষণা করলেন আজকের প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকারী ছাত্র ইশতিয়াক আহমদ দরভাঙ্গবী, তখন খুশি ও আনন্দে আমি আত্মহারা হয়ে গেলাম। এরপর তিনি আমাকে ধন্যবাদ জানালেন এবং সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য অত্যন্ত উৎসাহ দিলেন।

এর পূর্বেও আমি প্রবন্ধ প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলাম এবং আল্লাহর রহমতে সবগুলোতেই প্রথম স্থান অধিকার করার তাওফীক আমার হয়েছে। কিন্তু এই প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকার করায় পূর্বের প্রতিযোগিতাগুলো থেকে বেশি আনন্দ লাগছিল। কারণ পূর্বেকার প্রতিযোগিতাগুলো শুধু দারুল উলূমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। আর এই প্রতিযোগিতাটি ছিল নিখিল ভারত পর্যায়ের। বিভিন্ন মাদরাসার মেধাবী ও নির্বাচিত ছাত্ররাই এতে অংশ নিয়েছিল। দ্বিতীয়ত পূর্বেকার প্রতিযোগিতাগুলোয় আমার প্রবন্ধের ভাষা ছিল উর্দূ আর এই প্রতিযোগিতায় আমার প্রবন্ধের ভাষা হলো আরবী। আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানে পারদর্শী ব্যক্তিবর্গের আলোচনা

কাযী সাহেবের সাথে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানে পারদর্শী কয়েকজন বিশেষজ্ঞও ছিলেন। তাদের মধ্যে একজন ‘মানবাধিকার ও ইসলাম’ শীর্ষক আলোচনা পেশ করলেন। আরেকজন ছিলেন বিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ। পাশাপাশি তিনি অত্যন্ত দীনদার, ভারসাম্যপূর্ণ ও মধ্যপন্থী লোক ছিলেন। তাঁর ওপর ইসলাম ও কুরআনের বিরাট প্রাবল্য ছিল। বয়ানের ধরনও ছিল খুব সুন্দর। তাঁর নাম হলো আসলাম পারভেজ। এক ঘণ্টার অধিক সময় ধরে তিনি পরিবেশ দূষণ ও ইসলাম’ বিষয়ে আলোচনা পেশ করলেন। বয়ানের ভাষাগুলো ছিল খুব সুমিষ্ট। কুরআন হাতে নিয়ে অত্যন্ত ভদ্র ও মার্জিতভাবে তার কথা শুরু করলেন। আধুনিক বিজ্ঞানের আলোকে পরিবেশ দূষণ ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে অত্যন্ত সারগর্ভ আলোচনা করে ইসলামের পাক পবিত্রতা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, বৃক্ষ, ভূমি, চন্দ্র, সূর্য ইত্যাদির বৈশিষ্ট্য ও উপকারিতাকে কুরআন-সুন্নাহ’র আলোকে অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরলেন। ভাষা ছিল অত্যন্ত সহজ, সরল ও বোধগম্য। মনে হচ্ছিল না যে, তিনি কোন আধুনিক প্রতিষ্ঠানের লোক এবং নিরেট ইংরেজির পরিবেশে প্রতিপালিত ।

ইউনিভার্সিটি ও মাদরাসাগুলোতে ভাষার মধ্যে বিরাট দূরত্ব সৃষ্টি হয়ে গেছে। সাধারণত ইংরেজি পরিবেশে উর্দুকেও ইংরেজি বানিয়ে দেবার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। অনেকে উর্দূ থেকে সম্পর্কহীনতার কারণে এবং অনেকে লৌকিকতাস্বরূপ শ্রোতাদের প্রভাবিত করার জন্য উর্দুর মধ্যে বেশির ভাগ ইংরেজি বলে। আসলাম পারভেজ সাহেব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বয়ান দিয়ে ছাত্রদের মোহিত করলেন। বিজ্ঞানের ওপর এত সূক্ষ্ম বয়ান আমি দারুল উলূমে থাকাকালীন আর কখনো শুনিনি এবং এমন পরিচ্ছন্ন মেজাযের বিজ্ঞানীর সাথেও আমার প্রথমবার সাক্ষাতের সুযোগ ঘটে।

কাজী সাহেব আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানের পারদর্শীদের নিজের পাশে রাখতেন। আধুনিক আবিষ্কার উদ্ভাবন থেকে উপকৃত হওয়ার ক্ষেত্রে কাষী সাহেব অত্যন্ত উদার ও প্রশস্তচিত্তের অধিকারী ছিলেন। তিনি তাঁর সমসাময়িকদেরকেও নিজের মত দেখতে চাইতেন। এজন্য তিনি বিভিন্ন মাদরাসায় লেকচারের ধারা শুরু করেছিলেন। যার মাধ্যমে মাদরাসার ছাত্ররা আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞান, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ ও রাষ্ট্র সম্পর্কে নতুন নতুন জ্ঞান আহরণের সুযোগ পেত।

আসলাম পারভেজ সাহেবের কাছে ছাত্ররা বিভিন্ন প্রশ্ন করেন। এর মধ্যে একটি প্রশ্ন এও ছিল যে, সাইন্সের এমন একটি কিতাবের নাম বলে দিন, যা থেকে আমরা এ ধরনের জ্ঞান আহরণ করতে পারব। তিনি সাথে সাথে হাতের কুরআন উচিয়ে বললেন, এই কিতাব পড়ুন। এটি বিজ্ঞানের সবচেয়ে উন্নত ও নির্ভরযোগ্য কিতাব। এ ছাড়া বিজ্ঞানের অন্যান্য কিতাব পড়লে হয়তবা আপনারা বিপথগামী হয়ে যাবেন। এই কিতাবে আল্লাহ তাআলা সৃষ্টিকুল ও তার সকল বস্তুর আলোচনা করেছেন। এতে চিন্তা করুন। বিজ্ঞানের অনেক কিছু জানতে পারবেন। যদিও এটি সাইন্সের কিতাব নয় কিন্তু বিজ্ঞান সম্পর্কে এর উসূল ও মূলনীতি অত্যন্ত মজবুত ও সুদৃঢ়। এতে দৃঢ়তা আছে, পতন নেই। কুরআনে চিন্তা ফিকির করলে যা অর্জন হবে, সাইন্সের অন্য কিতাব অধ্যয়ন করলে তা অর্জন হবেনা। যদিও আমি সেসময় উপলদ্ধি করতে পারিনি যে, তিনি বিজ্ঞান ও কুরআন সম্পর্কে সেই দৃষ্টিভঙ্গিই পোষণ করেন, যা পোষণ করতেন স্যার সাইয়েদ আহমদ খান, না তার থেকে ভিন্ন ও মধ্যম চিন্তাধারার অধিকারী ছিলেন। এরপরও তাঁর দরদভরা বয়ান ও কাযী সাহেবের সোহবতের বরকতে তাঁর মধ্যে ভারসাম্য ও মধ্যপন্থী মেজায লক্ষ্য করেছি। ক্লোনিং এর পরিচিতি সম্পর্কে জনাব আসলাম পারভেজ সাহেবের একটি পুস্তিকা ফিকাহ একাডেমী প্রকাশ করেছে। সাধারণ উর্দু জানে এমন ব্যক্তিও তা পড়তে পারেন।

আলোচনার কর্মপদ্ধতি

প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠানটি ছিল অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী। প্রতিটি বিষয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা হয়েছে। এর পদ্ধতি ছিল, প্রথমে বড় কোন একজন ব্যক্তিত্ব যেমন দারুল উলূম নদওয়াতুল ওলামার উস্তাদ মাওলানা আতীক আহমদ বাসতভী এবং এ ধরনের কোন আকাবির বিয়ষটির ওপর সারগর্ভ আলোচনা পেশ করতেন। তারপর প্রতিযোগী ছাত্রদেরকে একের পর এক নির্ধারিত বিষয়ে আলোচনার জন্য আহবান করা হতো। প্রতিযোগীরা দলীল প্রমাণের আলোকে অত্যন্ত সারগর্ভ আলোচনা পেশ করত। অনুষ্ঠানের শুরুতে অনুষ্ঠানে আলোচনার পদ্ধতিও বলে দেওয়া হতো।

প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন কাযী সাহেব রহ.। মাঝে মাঝে তিনি প্রতিযোগীদের উৎসাহ, পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা দান করতেন। রাত পর্যন্ত অনুষ্ঠান হয়েছে। ছাত্ররা স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাতে অংশগ্রহণ করেছে। দারুল উলূমের গোটা হল কানায় কানায় ভরা ছিল। দ্বিতীয় দিন প্রোগ্রাম হয়েছে। কাযী সাহেব খুব ভোরে দারুল উলূম ত্যাগ করেন। দ্বিতীয় দিনও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি আলোচনা পেশ করেন। সবশেষে ছাত্রদেরকেও তাদের অভিব্যক্তি ও প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার সুযোগ দেওয়া হয়। আমার পুরস্কার

ফিকহী আলোচনায় অংশগ্রহণকারী ছাত্রদেরকে দুপুরের দিকে অতি মূল্যবান পুরস্কারে ভূষিত করেন। প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অধিকারী ছাত্রদেরকে বই-পুস্তকের সাথে নগদ অর্থও পুরস্কারস্বরূপ দেওয়া হয়। অন্যদের পুরস্কারের কথা তো স্মরণ নেই, অবশ্য আমাকে বই-পুস্তকের সাথে খামের মধ্যে পনেরশ’ রুপি নগদ দেওয়া হয়। হাদীস, ফিকাহ, ফতোয়া ও ইসলামিয়াতের ওপর আরবী ও উর্দূ বিভিন্ন কিতাবও ছিল। উর্দূর মধ্যে ছিল ফিকাহ একাডেমী থেকে প্রকাশিত ফিকহী মাজাল্লাত, জাদীদ তিজারতী শেকলেঁ, জরূরত ও হাজত, শেয়ার আওর কোম্পানী, হযরত মুফতী নিযামুদ্দীন আজমী রহ. এর কিতাব মুনতাখাবাত নিযামুল ফতোয়া প্রথম খণ্ড আর আরবীর মধ্যে ছিল, ইসলাহুল ফিকরিল ইসলামী আযেমাতুল আকলিল মুসলিম, হাওলা তাশকীলিল আকলিল মুসলিম এবং বহস ও নযরের বিশেষ সংখ্যাটি, যার মধ্যে আধুনিক মাসায়িলের সমাধানের পদ্ধতি, উরফ ও আদাতের শরয়ী মর্যাদা, নস ও মাসলাহাতের মাঝে সমন্বয় ও বৈপরিত্য, আকল ও ওহীর পারস্পরিক সম্পর্ক, ফিকহী নযরিয়াত এবং ইজতিহাদের পদ্ধতি ইত্যাদি আলোচনা করা হয়েছিল।

এ সবের মধ্যে যে পুরস্কারটি আমার নিকট সবচেয়ে বেশি পছন্দনীয় হয়েছে সেটি হলো, ইবনে মাজার নতুন তাহকীকি কপি, যার তাহকীক করেছেন হযরত মাওলানা মোস্তফা আজমী দা. বা.। এটি চার খন্ডে প্রকাশিত। আসল কিতাবের তাহকীকসহ দুই খন্ড। আর দুই খন্ড হাদীস বের করার জন্য সূচীপত্র। সূচী দেওয়া হয়েছে দশ ধরনের। আলফাযে হাদীস, আয়াতে কুরআন, আহাদীসে কওলিয়া, আসমায়ে কুওয়াত, আসমায়ে আ’লাম, আমাকিন, আসারে সাহাবাহ ও আশআর ইত্যাদি। মোটকথা, ইবনে মাজার হাদীসের কোন একটি শব্দ স্মরণ থাকলেই সূচীপত্রে সে হাদীসটি পেয়ে যাবে।

ইবনে মাজার এই কপিটি হাতে নিলেই কাযী সাহেবের কথা আমার মনে পড়ে যেত। তখন তাঁর দীর্ঘ জীবনের জন্য দুআ করতাম, আর এখন দুআ করি, হে আল্লাহ! কাযী সাহেবের ওপর রহমতের বারিধারা বর্ষণ করুন, তাঁর ওপর আপনি সন্তুষ্ট হয়ে যান এবং তাঁকে জান্নাতের সুউচ্চ আসনে সমাসীন করুন। আমীন।

ভাষান্তর : আবু তাসনীম উমাইর

মাহে জিলহজ্ব ও কুরবানীর ফযীলত করণীয় ও বর্জনীয় || রাহে সুন্নাত ব্লগ

উলামায়ে কেরাম : মর্যাদা, দা‌য়িত্ব ও কর্তব্য

কুরআনুল কারিমের কথা প্রবন্ধটি পড়তে ক্লিক করুন
আরো জানতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েব সাইট রাহে সুন্নাত ব্লগ

Leave a Reply

Your email address will not be published.