পবিত্র-কুরআন-ও-সন্ত্রাসবাদ-(পর্ব দুই)

পবিত্র কুরআন ও সন্ত্রাসবাদ (পর্ব-দুই)

ইসলাম প্রতিদিন কুরআন ও সুন্নাহ প্রবন্ধ

পবিত্র কুরআন ও সন্ত্রাসবাদ (পর্ব-দুই)

কুরআনে জিহাদের নির্দেশ এ ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি করেছে যে, কুরআন নিরপরাধ অমুসলিমদের ওপর আক্রমণ করার কথা বলে এবং তাদেরকে নির্বিচারে হত্যার অনুমতি দেয়। এক্ষেত্রে তারা সেসব আয়াত দিয়ে প্রমাণ পেশ করে, যেখানে কাফেরদেরকে ব্যাপকভাবে হত্যা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এটা নিতান্তই বিভ্রান্তি। এ আয়াতের সম্পর্ক মূলত মক্কার মুশরিকদের সঙ্গে যারা সরাসরি মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত ছিল, মুসলমানদের পক্ষ থেকে পেশকৃত সন্ধিপ্রস্তাব যারা কেবলি প্রত্যাখ্যান করেছে। যারা মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত নয়, তাদেরকে দেশান্তর করতে চায় না, কুরআন তাদের সঙ্গে সদাচার, শিষ্টাচার ও সাহায্য—সহযোগিতার নির্দেশ দেয়। কুরআন বলে,

لَا یَنْهٰىكُمُ اللهُ  عَنِ الَّذِیْنَ لَمْ یُقَاتِلُوْكُمْ فِی الدِّیْنِ وَ لَمْ  یُخْرِجُوْكُمْ مِّنْ  دِیَارِكُمْ  اَنْ  تَبَرُّوْهُمْ وَ تُقْسِطُوْۤا اِلَیْهِمْ ؕ اِنَّ  اللهَ یُحِبُّ الْمُقْسِطِیْنَ

‘দীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে না এবং তোমাদেরকে স্বদেশ থেকে বহিষ্কার করে না তাদের প্রতি মহানুভবতা প্রদর্শন ও ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদেরকে নিষেধ করেন না। আল্লাহ তো ন্যায়পরায়ণদের ভালোবাসেন। ’ [মুমতাহিনা : ৮]

সন্ত্রাসবাদে এ বিষয়ে দৃষ্টি দেয়া হয় না যে, জালেম মূলত কে? বরং অপরাধী নিরপরাধ নির্বিশেষে সবাইকে টার্গেট করা হয়। ইসলাম এটাকে বেআইনি ও অমানবিক কর্মকাণ্ড সাব্যস্ত করে। পবিত্র কুরআনে এ আইন প্রণয়ন করা হয়েছে যে, একজনের অপরাধের বোঝা অন্যের ঘাড়ে চাপানো যাবে না। এ ব্যাপারে আল্লাহ পাক বলেন,

وَلَا تَزِرُ وَازِرَۃٌ  وِّزْرَ اُخْرٰی ؕ

‘কোনো বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না।’ [ফাতের : ১৮]

এমনিভাবে কুরআন একজনের হত্যাকে পুরো মানবজাতির হত্যার নামান্তর ঘোষণা করেছে। আল্লাহ পাক বলেন, 

مَنْ قَتَلَ نَفْسًۢا بِغَیْرِ نَفْسٍ اَوْ فَسَادٍ فِی الْاَرْضِ فَکَاَنَّمَا قَتَلَ النَّاسَ جَمِیْعًا ؕ

‘নরহত্যা অথবা দুনিয়ায় ধ্বংসাত্মক কাজ করা ব্যতীত কেউ কাউকেও হত্যা করলে সে যেনো দুনিয়ার সকল মানুষকেই হত্যা করলো।’ [মায়েদা : ৩২]

কুরআন সেসব কারণ মূলোৎপাটনের কথা বলে যেসব কারণে সন্ত্রাসবাদের উদ্ভব হয়। সন্ত্রাসবাদের প্রধান কারণ হলো, একে অন্যকে জোরপূর্বক নিজের আকীদা—বিশ্বাস মানতে বাধ্য করা। খৃস্টানদের ধর্মীয় ইতিহাস এর খোলা দৃষ্টান্ত। পবিত্র কুরআন স্পষ্ট ঘোষণা করেছে, দীনের ব্যাপারে কোনো জোর—জবরদস্তি নেই। আল্লাহ পাক বলেন,

لَاۤ اِكْرَاهَ فِی الدِّیْنِ ۟ۙ قَدْ تَّبَیَّنَ الرُّشْدُ مِنَ الْغَیِّ ۚ

‘দীন গ্রহণে কোনো জোর—জবরদস্তি নেই; সত্য পথ ভ্রান্ত পথ থেকে সুস্পষ্ট হয়ে গেছে।’ [বাকারা : ২৫৬]

এমনিভাবে নিষেধ করা হয়েছে কেউ যেনো অন্য ধর্মের পাদ্রী—পুরোহিতদের নিন্দামন্দ না করে। কেননা এতে তাদের মাঝে উত্তেজনা দেখা দেবে। ফলে তারাও আল্লাহকে গালি দেবে। আল্লাহ পাক বলেন—

وَلَا تَسُبُّوا الَّذِیْنَ یَدْعُوْنَ مِنْ دُوْنِ اللهِ فَیَسُبُّوا اللهَ عَدْوًۢا بِغَیْرِ عِلْمٍ ؕ 

‘আল্লাহকে ছাড়া যাদেরকে তারা ডাকে, তাদেরকে তোমরা গালি দিও না। কেননা তারা সীমালঙ্ঘন করে অজ্ঞানতাবশত আল্লাহকেও গালি দেবে।’ [আনয়াম : ১০৮]

কোনো সমাজে সন্ত্রাসবাদ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার প্রধান কারণ হলো, জুলুম—নির্যাতন ও বেইনসাফি। মজলুম যদি নিরন্তর নিপীড়িত হতে থাকে, জালেমের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ক্ষমতা না থাকে, অব্যাহতভাবে ন্যায়—ইনসাফ থেকে বঞ্চিত হয়, তাহলে তার মাঝে জ্বলে ওঠে চরম প্রতিশোধস্পৃহা। যখন সে দেখে আইনের পথ বন্ধ, তখন সে সন্ত্রাসের পথ বেছে নেয়।

সুতরাং সন্ত্রাস দমনের সবচে’ কার্যকর পদ্ধতি হলো, সমাজে জুলুম—নির্যাতনের পথ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দেয়া, নিরপেক্ষভাবে ন্যায়—নীতি প্রতিষ্ঠা করা, যাতে সন্ত্রাসবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে। এজন্যই কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় ন্যায়—নীতির নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে জোরালো তাকীদ করা হয়েছে। আল্লাহ পাক বলেন—

اِنَّ اللهَ یَاْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْاِحْسَانِ

‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায় ও ইহসানের নির্দেশ দেন।’ [নাহল : ৯০]

কুরআন আরো নির্দেশ দেয়, কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি শত্রুতা যেনো তোমাদেরকে জুলুম ও বেইনসাফির প্রতি উদ্বুদ্ধ না করে। সুতরাং তোমরা ন্যায় ও ইনসাফ কায়েম করো—

وَلَا یَجْرِمَنَّكُمْ شَنَاٰنُ قَوْمٍ عَلٰۤی اَلَّا تَعْدِلُوْا ؕ اِعْدِلُوْا ۟

‘কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ তোমাদেরকে যেনো কখনো সুবিচার বর্জনে প্ররোচিত না করে, সুবিচার করো।’ [মায়েদা : ৮]

বর্তমানে অবস্থা হলো, ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে জোরেশোরে চলছে সন্ত্রাসবাদের প্রোপাগাণ্ডা। অথচ মুসলমানরা পৃথিবীতে রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসের শিকার। মুসলমানরা যেখানে সংখ্যালঘু সেখানকার কথা তো বলাই বাহুল্য। এমনকি সংখ্যাগুরু মুসলমানরাও নিজেদের দেশে ইসলামি আইন বাস্তবায়ন করতে চাইলে তাদেরকে সভ্যতা—বিরোধী ও  মৌলবাদী বলে গালি দেয়া হয়। তাদের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়। তাদেরকে সেকথাই বলা হয় যে কথা বলা হয়েছিল নবী—রাসূলদের। যেমন হযরত শোয়াইব আ. ও তাঁর অনুসারীদেরকে বলা হয়েছে—

قَالَ الْمَلَاُ الَّذِیْنَ اسْتَكْبَرُوْا مِنْ قَوْمِهٖ لَنُخْرِجَنَّکَ یٰشُعَیْبُ وَالَّذِیْنَ اٰمَنُوْا مَعَکَ مِنْ قَرْیَتِنَاۤ  اَوْ لَتَعُوْدُنَّ فِیْ مِلَّتِنَا ؕ

‘তার সম্প্রদায়ের দাম্ভিক প্রধানরা বললো, ‘হে শুয়াইব! আমরা তোমাকে ও তোমার সঙ্গে যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে আমাদের জনপদ থেকে বের করে দেবই অথবা তোমাদেরকে আমাদের ধর্মাদর্শে ফিরে আসতে হবে।’ [আ’রাফ : ৮৮]

আজ হিন্দুস্তানের সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে এ শ্লোগান শোনা যায়—কোথায় যাবে মুসলমান, পাকিস্তান না কবরস্তান? হযরত শোয়াইব আ.—এর সম্প্রদায় তাকে যে কথা বলেছিল সেটা কি এরচে’ ভিন্ন? পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মুসলমানদের সঙ্গে প্রায় একই রকম আচরণ করা হচ্ছে। ইসলামের শত্রুরা ততক্ষণ পর্যন্ত নিরস্ত হবে না যতক্ষণ না মুসলমানরা নিজেদের আকীদা—বিশ্বাস ও সভ্যতা—সংস্কৃতি বিসর্জন দেবে। জানা কথা, মুসলমানদের জন্য এটা কখনো সম্ভব নয়। পবিত্র কুরআনে ইহুদি—খৃস্টানদের মানসিকতা এবং ইসলামের প্রতি তাদের হিংসা—বিদ্বেষের নিখুঁত চিত্রায়ন করা হয়েছে এভাবে—

وَلَنْ تَرْضٰی عَنْکَ الْیَهُوْدُ وَلَا النَّصٰرٰی حَتّٰی تَتَّبِعَ مِلَّتَهُمْ ؕ

‘ইহুদি ও খৃস্টানরা তোমার প্রতি কখনো সন্তুষ্ট হবে না, যতক্ষণ না তুমি তাদের ধর্মাদর্শ গ্রহণ করো।’ [বাকারা : ১২০]

আজ পৃথিবীতে মুসলমানদের বিরুদ্ধে শত্রুতার আসল কারণ এটাই—তারা পশ্চিমাদের অবাধ সভ্যতা—সংস্কৃতির সামনে মাথানত করে না। বরং নিজেদেরকে চরিত্র ও নৈতিকতা, লজ্জা ও শালীনতার পতাকাবাহী হিসাবে প্রকাশ করে। এই সঙ্গিন মুহূর্তে মুসলমানদের উচিত ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার পরিচয় দেয়া এবং প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের যৌথ—সন্ত্রাস ও মানবতাবিরোধী কার্যকলাপে ভীত—সন্ত্রস্ত না হওয়া। কেননা এই ঘুর্ণিঝড় একদিন থেমে যাবে। আল্লাহ পাক সাহাবায়ে কেরামের ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার প্রশংসা করে বলেছেন, তাদেরকে যতো ভয় দেখানো হতো ততোই তাদের ঈমান বেড়ে যেতো— 

اَلَّذِیْنَ قَالَ لَهُمُ النَّاسُ  اِنَّ النَّاسَ قَدْ جَمَعُوْا لَكُمْ فَاخْشَوْهُمْ فَزَادَهُمْ اِیْمَانًا ٭ۖ

‘তাদেরকে লোকে বলেছিল, তোমাদের বিরুদ্ধে লোক জমায়েত হয়েছে, সুতরাং তোমরা তাদেরকে ভয় করো; কিন্তু এটা তাদের ঈমান দৃঢ়তর করেছিল।’   [আলে ইমরান : ১৭৩]

ঈমানের আলামত এটাই—দীনের কালিমা বুলন্দের পথে যতো বিপদাপদ আসুক, ঘৃণা—বিদ্বেষের তুমুল ঝড় উঠুক, বিরোধিতার তরঙ্গবিক্ষুব্ধ ঢেউ উঠুক, ভীতিজনক ও বিভীষিকাময় পরিস্থিতি সৃষ্টি হোক, মনোবল ভেঙ্গে যাওয়ার মতো অবস্থা হোক, ততোই তাদের হিম্মত বুলন্দ হবে এবং মনোবল সুদৃঢ় হবে। সৃষ্টিজীবের ভয় তাদের ওপর প্রবল হতে পারবে না।

বর্তমানে বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের বিরুদ্ধে যে সন্ত্রাসবাদের প্রোপাগাণ্ডা চলছে, এমন কি কুরআনের মতো মহান গ্রন্থের সমালোচনা করা হচ্ছে, এর উদ্দেশ্য এটাই—যেনো মুসলমানদের হিম্মত ভেঙ্গে যায়; পশ্চিমাদের হুমকি—ধমকির সামনে মাথানত করে এবং ইসলামের ব্যাপারে হীনম্মন্যতার শিকার হয়। সুতরাং এমতাবস্থায় আমাদের উচিত নিজেদের হিম্মত উঁচু রাখা এবং ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার পথ অলবম্বন করা।

পবিত্র কুরআন ও সন্ত্রাসবাদ (পর্ব-দুই) সমাপ্ত।


পবিত্র কুরআন ও সন্ত্রাসবাদ (পর্ব-দুই)

আল্লাহর আইন শাশ্বত ও চিরন্তন

মহানবী জগতের আদর্শ মহামানব। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ

Leave a Reply

Your email address will not be published.