পীর-মুরীদীর উদ্দেশ্য । তরীকুস সুলুক পর্ব ৭ । মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ আইয়ূবী । রাহে সুন্নাত মিডিয়া

ইসলাম প্রতিদিন রাহে তরীকত/আত্মশুদ্ধি
কামেল পীরের সন্ধান পাওয়ার পর তার হাতে মুরীদ হওয়ার পূর্বে মুরীদ হওয়ার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বুঝতে হবে। কারণ, মুরীদ হওয়ার পিছনে মানুষের অনেক রকমের উদ্দেশ্য হয়ে থাকে। কেউ তো চায় যে, আমি কারামাতের অধিকারী হবো এবং কাশফের মাধ্যমে এমন অনেক  বিষয় জানতে পারবো, যা অন্যদের জানা নেই। কিন্তু আপনি উপরের বয়ানে জেনে এসেছেন যে, খোদ পীরের মধ্যেই এমন কোনো কারামাত থাকা বা কাশফের অধিকারী হওয়া জরুরী নয়, যার দ্বারা সে এমন সব জিনিস সম্পর্কে জানতে পারবে যা অন্যদের জানা নেই। তাহলে মুরীদ বেচারা এর কী-বা আকাক্সক্ষা করবে? কেউ এরূপ মনে করে যে, মুরীদ হওয়ার দ্বারা পীর সাহেব গুনাহ মাফের দায়িত্ব নিয়ে নিবে। যতো পাপকাজই করুক না কেনো, কেয়ামতের দিন পীর তাকে দোযখে যাওয়া থেকে রক্ষা করবে। এটা চরম ভুল ধারণা। জনাব রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে তাঁর মেয়ে হজরত ফাতিমা (রাযি.) কে বলেছেন,
 يَا فَاطِمَةُ أَنْقِذِيْ نَفْسَكِ مِنَ النَّارِ
‘হে ফাতেমা! নিজেকে দোযখ থেকে বাঁচাও।’ অর্থাৎ নেক আমল করো।
কেউ বোঝে যে, পীর সাহেব একনজরে আমাকে কামেল করে দিবে। আমাদের কোনো পরিশ্রমও করতে হবে না বা গুনাহ ছাড়ার ইচ্ছাও করতে হবে না। এভাবেই যদি কাজ হয়ে যেতো, তাহলে সাহাবায়ে কেরামের কিছুই করার প্রয়োজন হতো না। জনাব রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেয়ে কামেল আর কে আছে? যদিও কারামাত-স্বরূপ কোথাও এরূপও হয়েছে যে, কোনো বুজুর্গ একনজরে কাউকে কামেল করে দিয়েছেন। কিন্তু কারামাত সবসময় হওয়া তো জরুরী নয় বা সব আল্লাহর ওলী থেকে হওয়াও জরুরী নয়। তাই এ ভরসায় থাকা মারাত্মক ভুল। কেউ বলে যে, অনেক আবেগ, উদ্যম, উন্মত্ততা ও উন্মাদনা সৃষ্টি হবে। হৈচৈ করবো, শ্লোগান দিবো, নিজে নিজে গুনাহ ছুটে যাবে। গুনাহ করার ইচ্ছাও থাকবে না। নেককাজ করার জন্য ইচ্ছাও করতে হবে না, নিজে নিজেই সব নেককাজ হয়ে যাবে। মনের কুমন্ত্রণা ও খটকা সব মিটে যাবে। মোটকথা, এক আত্মহারা অবস্থা বিরাজ করবে। এ চিন্তাটিকে পূর্বের চিন্তাসমূহের তুলনায় উৎকৃষ্ট মনে করা হয়। কিন্তু এর কারণও অজ্ঞতা। এ সমস্ত অবস্থাকে ‘কায়ফিয়্যাত’ ও ‘হালাত’ বলা হয়। কিন্তু ‘হালাত’ ও ভাবের সৃষ্টি হওয়া মানুষের এখতিয়ার বহির্ভূত বিষয়। তাছাড়া ‘হালাত’ বা ভাবের উদয় হওয়া উত্তম হলেও, তা উদ্দেশ্য নয়। সে বস্তুই উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হতে পারে, যা অর্জন করা মানুষের এখতিয়ারাধীন। গভীরভাবে চিন্তা করে দেখা গেছে যে, এ ধরনের খাহেশের পিছনে নফসের কুমতলব নিহিত রয়েছে। আর তা হলো, নফস আরাম, মজা ও প্রসিদ্ধি চায়, যা এ সমস্ত ভাবের মধ্যে পাওয়া যায়। যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির অন্বেষী হবে এ সম্পর্কে পরবর্তীতে আলোচনা আসছে যে, আধ্যাত্মিকতার উদ্দেশ্যই হলো, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করা। এমন ব্যক্তির এ ধরনের খাহেশের সাথে কী সম্পর্ক? সে তো নিজের অবস্থা এমন বানাবে যে, তার অবস্থাই যেন বলে
فراق و وصل چہ باشد رضاء دوست طلب
کہ حیف باشراذ و غیر او تمنائے
 অর্থ, বিরহ আর মিলন সমান। আসল তো হলো তাঁর সন্তুষ্টি। আল্লাহর নিকট তাঁকে ছাড়া অন্য কিছুর প্রার্থনা করা আফসোসের ব্যাপার।
روز ہاگر رفت گورو باک نیست
 تو بماں اے آنکہ جز تو پاک نیست
অর্থ, ভাব ও উন্মাদনা চলে গেলে যাক, কোনো আক্ষেপ নেই। আল্লাহর সাথে সম্পর্ক অটুট থাকা চাই, যার মতো অন্য কোনো কিছু পবিত্র নয়।
بس زبون وسوسه باشی دلا
گرطرب را باز دانی از بالا
অর্থ, হে মন! তুমি তো এখনও কুচিন্তাতেই মগ্ন রয়েছো। তুমি যদি আনন্দ ও বেদনার পার্থক্য বুঝতে! উপরন্তু এ ধরনের লোক দু’প্রকারের খারাবীতে লিপ্ত হয়ে থাকে। কারণ, এ সমস্ত ভাব ও হালাত তার অর্জিত হয় অথবা হয় না। যদি অর্জিত হয়, তাহলে সে যেহেতু একেই বুজুর্গী মনে করে, তাই সে নিজেকে কামেল মনে করতে আরম্ভ করে। সে এ সমস্ত হালাত ও ভাবকে যথেষ্ট মনে করে প্রকৃত পরহেযগারী ও ইবাদত-বন্দেগীর ব্যাপারে গাফেল ও নিশ্চিন্ত হয়ে যায়। নিজের জন্য ইবাদতের জরুরত বোধ করে না। বা কমপক্ষে ইবাদতকে মূল্যহীন মনে করতে থাকে। আর যদি এগুলো হাসেল না হয়, তাহলে এ দুঃখে সে নিঃশেষ হতে থাকে। আর এ অবস্থা শুধু এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং যে কোনো ব্যক্তি এমন কিছু অর্জনের ইচ্ছা করবে, যা তার এখতিয়ার বহির্ভূত, সে-ই দুশ্চিন্তা ও পেরেশায়ীতে আক্রান্ত হবে।
কেউ বলে যে, পীর সাহেবের নিকট বড় বড় আমল আছে, যা খুব কার্যকরী। যখন প্রয়োজন পড়বে তার থেকে তাবিজ-কবজ চেয়ে নিবো বা পীর সাহেবের দু’আ খুব কবুল হয়। মামলা-মোকদ্দমায় ও অন্যান্য প্রয়োজনে তার দ্বারা দু’আ করাবো, ফলে সব কাজ আমার মর্জিমতো হবে। যেন সমস্ত ক্ষমতা পীর সাহেবের হাতে রয়েছে! বা তার নিকট থেকে এমন কিছু শিখে নিবো, যার দ্বারা আমি বরকতের অধিকারী হয়ে যাবো। আমি ঝাড়-ফুঁক দিলে বা হাত দিয়ে শরীর মুছে দিলে অসুস্থ লোক সুস্থ হয়ে যাবে। এ ধরনের লোকেরা এ ধরনের আমল ও তার প্রভাবকেই বুজুুর্গী মনে করে। বুজুর্গীর সাথে এ সমস্ত আমলের যেহেতু কোনো সম্পর্ক নেই, আর এ ধরনের নিয়ত যেহেতু একান্তই দুনিয়া কামনা, তাই এতে দ্বিগুণ ভ্রান্তি রয়েছে। কেউ মনে করে যে, যিকির-শোগল করার দ্বারা আলো দেখা যাবে, বা গায়েবী আওয়াজ কোনো যাবে। এটাও সম্পূর্ণ ভুল ধারণা ও নির্বুদ্ধিতা। কারণ প্রথমত যিকির ও শোগল দ্বারা আলো দেখা দেওয়া বা আওয়াজ শুনতে পাওয়া জরুরী নয়। তাছাড়া এগুলো যিকির-শোগলের উদ্দেশ্যও নয়।
দ্বিতীয়ত যিকির-শোগল করার দ্বারা যে আলো দেখা যায়, যে রং দেখা যায় বা যে শব্দ কোনো যায়, কোনো কোনো সময় তা যিকিরকারীর মস্তিষ্কের প্রভাবে হয়ে থাকে, গায়েবের বিষয় হয় না।
তৃতীয়ত যদি একথা মেনেও নেওয়া হয় যে, গায়েবের বিষয় দেখতে পেয়েছে বা গায়েবের শব্দ শুনতে পেয়েছে, তাহলে তাতে কী লাভ হয়েছে? গায়েবের শব্দ শুনতে পাওয়ার দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য লাভ হয় না। আল্লাহর নৈকট্য তো তাঁর ইবাদত ও আনুগত্যের দ্বারা লাভ হয়। অনেক সময় শয়তান ফেরেশতার  রূপে দেখা দেয়, অথচ প্রকৃত অর্থে সে ফেরেশতা নয় বরং শয়তানই হয়ে থাকে। তাছাড়া মৃত্যুর পর কাফেররা যে গায়েবের অনেক কিছুই জানতে পারবে তা সবারই জানা কথা। যে জিনিস কাফেরদেরও লাভ হবে তা জানতে পারলে এমন কী কামেল হয়ে গেলো?
যখন একথা পরিষ্কার জানা হয়ে গেলো যে, উপরে যতো বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে, তার কোনোটিই লাভ করা পীর-মুরীদীর লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নয়, তাই এ সমস্ত চিন্তা-ফিকির মন থেকে ঝেড়ে ফেলে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভকেই পীর-মুরীদীর প্রকৃত উদ্দেশ্য মনে করবে। যা লাভ করার উপায় হলো, আল্লাহ তা’আলার সমস্ত হুকুম পালন করবে এবং নিয়মিত যিকির করবে। পীর এ কথাই বলে থাকেন আর মুরীদ সে অনুপাতেই আমল করে থাকে। যদিও এভাবে চলার দ্বারা তার ধারণামতো কোনো ভাবমত্ততা ও পূর্ণতা লাভ হলো না, কিন্তু আখেরাতে যিকির ও আল্লাহর আনুগত্যের ফায়দা অর্থাৎ আল্লাহর সন্তুষ্টি তার ঠিকই লাভ হবে। আল্লাহর সন্তুষ্টির ফলে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আল্লাহ তা’আলার দীদার নসীব হবে। দোযখ থেকে রক্ষা পাবে।
সংকলক : মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ আইয়ূবী

2 thoughts on “পীর-মুরীদীর উদ্দেশ্য । তরীকুস সুলুক পর্ব ৭ । মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ আইয়ূবী । রাহে সুন্নাত মিডিয়া

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *