মুজাহিদ তুমি বিনা ইলমের আস নীরব

মুজাহিদ! তুমি বিনে ইলমের আসর নীরব | মাওলানা মুহাম্মদ সালেম কাসেমী

আকাবির-আসলাফ জীবন কথা জীবনের গল্প মনীষী চরিত

মুজাহিদ! তুমি বিনে ইলমের আসর নীরব

মূল : মাওলানা মুহাম্মদ সালেম কাসেমী

আহলে হকের জামাত ওলামায়ে দেওবন্দের মধ্যে সর্বজন শ্রদ্ধেয় মাওলানা কাজী মুজাহিদুল ইসলাম কাসেমী রহ. একজন বিরল ও অতুলনীয় স্বাতন্ত্রের ধারক ছিলেন। তিনি অসাধারণ ইলমী বিদগ্ধতার পাশাপাশি প্রাজ্ঞতায় পরিপূর্ণ ধারণা ও উদার দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী ছিলেন। মতবিরোধপূর্ণ শরয়ী সমস্যাবলীর ব্যাপারে ওলামায়ে হকের বলয়ে তাঁর মতামতকে একপ্রকার নিষ্পত্তিমূলক বক্তব্য মনে করা হতো। তাঁর এই ইলমী ও ফিকহী মহব্বতের মর্যাদা অপরাপর গুণ-বৈশিষ্ট্য ও স্বাতন্ত্রের মধ্যে শীর্ষে ছিল। তাঁর ফিকহী ধারণা যেমন আল্লাহর বিশাল দান ছিল, তেমনি উক্ত মহা যোগ্যতার উন্নতির পাশাপাশি বাস্তবায়নের মূল্যবান ক্ষেত্র এবং সুযোগও আল্লাহ তাআলা বিশেষ অনুগ্রহে তাঁকে দান করেন। যার ফলে তিনি ফিকাহ শাস্ত্রের বিভিন্ন পরিবেশে লেখনী ও ফতোয়ার মাধ্যমে দীর্ঘকাল যাবত বিশাল খেদমত আঞ্জাম দিয়েছেন। যার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা ফিকাহ একাডেমী-এর একটি গর্ব করার মতো সাক্ষী। আল্লাহর নিকট তাঁর এই গ্রহণযোগ্যতা ও মানুষের কাছে নির্ভরযোগ্য সেবাসমূহ ইনশাআল্লাহ আখেরাতের পাথেয় তো বটেই, ইহকালেও দীর্ঘকাল অবধি অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে। খোদায়ী প্রচারণা ও মানুষের মুখে তার বহুমুখী খেদমতের পূর্ণ স্বীকারোক্তি গ্রহণযোগ্যতা ও নির্ভরযোগ্যতার শুধু আলামতই নয়, নিশ্চিত আলামত বটে। আর সে মর্মে এই আনন্দদায়ক বাস্তবতাকে অকাট্য সাক্ষ্যরূপে সাব্যস্ত করা যায় যে, তাঁর সত্তা ও সেবাসমূহের মহত্বের স্বীকৃতি মানুষের সাধারণ রীতি অনুযায়ী আজ কেবল মৃত্যুর পরেই হচ্ছে না; বরং জীবদ্দশায় আল্লাহ তাআলা তাঁকে সে স্বীকৃতির দ্বারা ধন্য করেছিলেন, যা সাধারণতঃ খুব স্বল্পসংখ্যক মানুষের ভাগ্যেই হয়ে থাকে। মরহুম মাওলানা সাহেবের অনন্য বৈশিষ্ট্য ছিল ব্যক্তি গঠন, যা দলবদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে অসাধারণ গুরুত্বের বিষয় ছিল। এমন ব্যক্তি গঠনকারী ব্যক্তিত্ব আহলে ইলম শ্রেণীর মধ্যে এতই দুষ্প্রাপ্য যে, বহু অনুসন্ধানের পরও খুবই স্বল্পসংখ্যক পাওয়া যায়। আর পাওয়া গেলেও তাঁর পরে আর বহুকাল অনুরূপ কাউকে পাওয়া যায় না।

অধমের মতে তিনি স্বীয় ফকীহসুলভ চেতনা ও রুচির মাধ্যমে ফিকাহ একাডেমী গড়ে তোলার সাহায্যে ব্যক্তিগঠনকেও সামগ্রিকভাবে এমন এক স্থায়ী রূপদান করেছেন যে, উক্ত প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বহুসংখ্যক নির্ভরযোগ্য উঁচুমানের ফিকাহবিদ ব্যক্তি দ্বারা মুসলিম মিল্লাত সর্বদা ধন্য ও সৌভাগ্যশীল হতে থাকবে। আর এই কার্যক্রম ইনশাআল্লাহ আখেরাতে তাঁর জন্য সদকায়ে জারিয়া হিসাবে পরিগণিত হবে।

ইসলাম শুধুমাত্র সর্বকালীনই নয়, বরং পাশাপাশি সার্বজনীনতা তথ্য আন্তর্জাতিক ও বিশ্বব্যাপী হওয়ারও দাবীদার। আর এটা স্পষ্ট যে, সে ধর্মই কেবল সার্বজনীন ও সর্বকালীন হওয়ার পাশাপাশি অপরিবর্তনীয় হতে পারে যাতে পৃথিবীর সকল ভূখণ্ডের বসবাসরত প্রত্যেক জাতির তাহযীব-তামাদ্দুন, কৃষ্টি-কালচার, সামাজিকতা, অর্থনৈতিকতা, চিন্তা-চেতনা, দৃষ্টিভঙ্গি ও উদ্ভূত ও নিত্য-নতুন সমস্যা ও প্রেক্ষাপটসমূহকে যাচাই ও পরখ করার মানদণ্ড থাকবে। গ্রহণযোগ্যতার কষ্টি-পাথর ও স্বীয় উচ্চমর্যাদা প্রমাণের দলীল প্রমাণ ও যৌক্তিকতা একটি অপরটির সঙ্গে সাধারণতঃ ভিন্নতর হয়ে থাকে।

এমতাবস্থায় যেসব চিন্তাধারা ও দৃষ্টিভঙ্গিসমূহ স্থায়ী কিংবা অপরিবর্তনীয় নয় সেটাকে বিশ্বের বিভিন্ন জাতি গ্রহণ করে নেওয়া কোন কঠিন ব্যাপার নয়। তবে বাহ্যিক দৃষ্টিতে ইসলামে কোন প্রকার পরিবর্তন ও বিবর্তন গ্রাহ্য বিশ্বময়তার গ্রহণযোগ্যতা অর্জন অসম্ভব না হলেও না হওয়ার কারণে সাধারণ জ্ঞানসম্পন্নদের নিকট অত্যন্ত কঠিন।

ইসলামকে ভাসাভাসা দৃষ্টি ও ভ্রান্ত চিন্তাধারাসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গ অন্যান্য ধর্মের সঙ্গে তুলনা করে এই ধারণা পোষণ করেন ইসলামকেও অন্যান্য সম্প্রদায়ের মতো অন্যদের চিন্তাধারা ও দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে নিতে হবে। তবে এই ধারণা ইসলামের হাকীকত সম্পর্কে বিলকুল অনবগত এবং ইসলামের মহান মর্যাদা ও মর্তবা সম্পর্কে সম্পূর্ণ বেখবর শ্রেণীর মানুষদের হতে পারে। কেননা, ইসলামের আকীদা-বিশ্বাস আল্লাহর পক্ষ হতে প্রদত্ত। এটা কোন মানবমস্তিষ্ক দ্বারা প্রস্তুত ও নির্মিত নয়। এ কারণে মানুষের স্বভাব ও রুচির সাথে সামঞ্জস্যতার পাশাপাশি প্রত্যেক যুক্তি ও গবেষণার কষ্টিপাথরে পরখ করার পর এই ব্যাপারে কোন সন্দেহ-সংশয় নেই যে, তাতে কোন ধরনের সংযোজন-বিয়োজনের প্রয়োজন নেই এবং তার কোন অধিকার বা সুযোগও নেই। এ কারণেই মহান আল্লাহর দীপ্ত ঘোষণা এমন একটি সর্বসম্মত বিষয়, যার সত্যতা ও যথার্থতা দেড় হাজার বছর যাবত ইসলামের শত্রুরাও চ্যালেঞ্জ করতে পারেনি।

এই ধর্মের উক্ত বিশ্বজনীনতা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই এ কথার দাবিদার যে, বিশ্বের বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর অত্যন্ত প্রিয় তাহযীব-তামাদ্দুন তথা কৃষ্টি কালচারকে সঙ্গে নিয়ে চলার যোগ্যতা রাখে। অতীতেও এটা প্রমাণিত যে, ইসলাম পৃথিবীর বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীকে অসাধাণরণভাবে প্রভাবিত করেছে এবং বিস্ময়করভাবে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে অর্ধশতাব্দী মধ্যে অর্ধ পৃথিবীতে গ্রহণযোগ্য হয়ে গিয়েছে। এটাই হলো সেই সার্বজনীন ইসলামী চিন্তাধারা যার জন্য প্রত্যেক যুগে বিস্তৃত চিন্তাধারার অধিকারী ব্যক্তিবর্গের প্রয়োজন। আর আলহামদুলিল্লাহ্! কোন যুগে আল্লাহর ফজলে এমন মহামূল্যবান ব্যক্তিত্ব থেকে ইসলাম বঞ্চিত থাকেনি। আজও বঞ্চিত নয়।

এই সার্বজনীন বিস্তৃত চিন্তাধারাকে আলেমে রব্বানী ইমাম ও পথিকৃৎ হযরত মাওলানা কাসেম নানুতবী রহ. দারুল উলূম দেওবন্দের মৌলিক তরবিয়তের বিষয়বস্তুতে শামিল করেন। ফলে দারুল উলূম ওয়াকফ দেওবন্দ ইসলামের সার্বজনীন পরিব্যপ্ত চিন্তার অধিকারী ব্যক্তিবর্গ থেকে শূন্য ছিল না।

বিগত শতাব্দীতে যে সকল ব্যক্তিবর্গের উক্ত বিশাল কাসেমীয় ব্যপ্তিময় ইসলামী চিন্তাধারা থেকে পূর্ণ হিস্যা নসীব হয়েছে, তাদের মধ্যে সম্মানিত বন্ধুবর মাওলানা মুজাহিদুল ইসলাম কাসেমী রহ.কে তালিকার শীর্ষে না রাখলে সেটা হবে এমন অপরাধ ও অকৃতজ্ঞতা, যেটাকে তাঁর অগণিত সেবা ও উদ্যোগ এবং অনস্বীকার্য সাক্ষ্যসমূহে সুরোভিত ইতিহাস কখনো ক্ষমা করবে না। মুফাক্কিরে মিল্লাত হযরত মাওলানা সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ. কর্তৃক এই বাস্তবতার বিবরণ দান দীনদার শ্রেণীর কাছে সর্বদা সম্মানিত ও সহপাঠী স্বীকারোক্তি সাব্যস্ত করা হয় যে, হাকীমুল ইসলাম হযরত মাওলানা কারী তৈয়্যেব সাহেব রহ. দারুল উলূম দেওবন্দকে কাসেমীয় উদার চিন্তাধারার ভিত্তির ওপর আন্তর্জাতিক মর্যাদা ও খ্যাতি এনে দেয়ার ব্যাপারে অন্য কারো অংশগ্রহণ ব্যতিরেকে শুধুমাত্র সফলতাই দান করেননি; বরং উক্ত কাসেমীয় সার্বজনীন চিন্তাধারাকে দীক্ষাদানের বুনিয়াদী দৃষ্টিভঙ্গির পর্যায়ভুক্ত করে সকল অনুসারী ও অনুরক্তদের জন্য উপকৃত হওয়ার প্রশস্ত পথও সুগম করে দিয়েছেন।

মুহতারাম মাওলানা মুজাহিদুল ইসলাম কাসেমী রহ. তাঁর উন্নত স্বকীয় চিন্তাধারাপুষ্ট যোগ্যতাসমূহের আলোকে দারুল উলূম দেওবন্দের উক্ত আন্তর্জাতিক ইসলামী গবেষণা দ্বারা নিজের ইলমী, দীনী ও যৌথ খেদমতসমূহের গণ্ডিকে সার্বজনীনতার দ্বারা পরিপূর্ণ রেখেছেন। এ কারণে তাঁর ব্যক্তিত্বের সর্বসম্মত মহত্ব ও গুরুত্ব কোনকালে এমনকি অদ্যবধি অগ্রাহ্য হয়নি এবং ইনশাআল্লাহ ভবিষ্যতে কখনো হবেও না।

আল্লাহ তাআলা তাঁর নিষ্ঠাপূর্ণ খেদমতসমূহকে পূর্ণ গ্রহণযোগ্যতা দান করে আখেরাতের পাথেয় সাব্যস্ত করুন এবং তাঁকে ইল্লিয়্যীনের সর্বোচ্চ সম্মানিত মাকাম দান করুন। আমীন।

ভাষান্তর : আবু তাসনীম উমাইর

আরো জানতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েব সাইট রাহে সুন্নাত ব্লগ

মুসলিম মিল্লাতের অতন্দ্র প্রহরী কাজী মুজাহিদুল ইসলাম কাসেমী রহ
নতুন প্রজন্মের নতুন অভিভাবক। কাজী মুজাহিদুল ইসলাম কাসেমী রহ.

Leave a Reply

Your email address will not be published.