সূর্যগ্রহণ সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি

সূর্যগ্রহণ সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি

ইতিহাস ও জীবনী ইসলাম প্রতিদিন কুরআন ও সুন্নাহ প্রবন্ধ

সূর্যগ্রহণ সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি

এই আসমান—জমিন, চন্দ্র—সূর্য ও মহাশূন্যে ভাসমান সমস্ত গ্রহ—নক্ষত্র আল্লাহ পাকের অপূর্ব নির্দশন। এসব নিয়ে ভাবলে আল্লাহ পাকের কুদরতের ওপর বিশ্বাস পাকাপোক্ত হয় এবং ঈমান তাজা হয়। এই পৃথিবী থেকে যেসব গ্রহ—নক্ষত্র খালি চোখে দেখা যায় তন্মধ্যে সবচে’ বড় সূর্য। পৃথিবীতে আল্লাহ পাকের হুকুমে সবচে’ বেশি প্রভাব রাখে সূর্য। এটি একটি উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক; যার বুকে অনবরত জ্বলছে আগুনের লেলিহান শিখা।

সূর্যের উত্তাপে প্রাণীকুলের জীবনাচার সচল থাকে। আল্লাহ পাকের কুদরত দেখুন, এতো বড় আগুনের কুণ্ডলি সূর্যকেও একটা নির্দিষ্ট কক্ষপথে আটকে রেখেছেন। ভূপৃষ্ঠ থেকে সূর্যের দূরত্ব অতি উপযুক্ত স্থানে রয়েছে। ফলে পৃথিবীর কোনো ক্ষতি হয় না। সূর্য যদি তার বর্তমান দূরত্ব থেকে কাছে চলে আসে তাহলে ভূপৃষ্ঠের সবকিছু জ্বলেপুড়ে ভষ্ম হয়ে যাবে। আর যদি দূরে সরে যায় তাহলে পৃথিবী বরফে জমে যাবে। পৃথিবীতে কোনো প্রাণীই বেঁচে থাকবে না। এটা আল্লাহ পাকের অপার কুদরত যে, তিনি মানুষের জন্য এমন একটি চেরাগ জ্বেলে রেখেছেন যার মাধ্যমে ভূপৃষ্ঠের প্রতিটি অনু—পরমাণু উত্তপ্ত থাকে। কখনো তার তাপ বেড়ে পৃথিবীতে আগুন লেগে যায় না। মানুষ এর মাধ্যমে উপকৃত হতে পারে আবার ক্ষতি থেকে নিরাপদ থাকতে পারে। এজন্য এটাকে আল্লাহ পাকের অত্যাশ্চর্য নিদর্শন বলা হয়।

ইসলামপূর্ব যুগে মানুষ ভ্রান্ত আকীদা—বিশ্বাস ও কুসংস্কারে আচ্ছন্ন ছিল। প্রতিটি অস্বাভাবিক ঘটনাকে নিজেদের মস্তিষ্ক—প্রসূত কাল্পনিক আকার দান করতো। সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণের ব্যাপারে মানুষের ধারণা ছিল—হয় কোনো মহামনীষী জন্মগ্রহণ করেছেন বা মৃত্যুবরণ করেছেন। ঘটনাক্রমে যেদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম—এর ছেলে হযরত ইবরাহিম ইন্তিকাল করেন সেদিন সূর্যগ্রহণ হয়। লোকেরা বলতে শুরু করলো, হয়ত রাসুলের ছেলের ইন্তিকাল হওয়ায় সূর্যগ্রহণ হয়েছে। ছেলের মৃত্যুতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুবই দুঃখিত ছিলেন। এতদ্সত্ত্বেও তিনি তাদের ভ্রান্ত ধারণা দূর করা জরুরি মনে করলেন। তৎক্ষণাৎ তিনি সে ব্যাপারে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং দু’রাকাত নামায পড়তে বলেন। পরে একটা খুতবা দেন। তাতে বলেন, চন্দ্র ও সূর্য আল্লাহ পাকের দুটি নিদর্শন। কারো জন্মে বা মৃত্যুতে গ্রহণ লাগে না। মৃত্যুর সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। যখনই তোমরা গ্রহণ লাগতে দেখো নামাজের দিকে ধাবিত হবে।

এটাই ছিল তাঁর তরবিয়তের পদ্ধতি। যে ঘটনাকে লোকেরা শিরকের ভিত্তি সাব্যস্ত করতো সেটাকে তিনি আল্লাহ পাকের একত্ববাদের দিকে ফিরিয়ে দিতেন। তাওহিদের আকীদা তাজা করার মাধ্যম বানাতেন। সূর্যগ্রহণের সময় একদিকে তিনি মানুষের কুসংস্কার দূর করেছেন অন্যদিকে দু’রাকাত নামায আদায়ের সুন্নতও জারি করেছেন। আর নামায আল্লাহ পাকের একত্ববাদের আমলি প্রকাশ। এর প্রতিটি রুকনের মাধ্যমে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক গভীর হয়। নামাজের মাধ্যমে আল্লাহ পাকের বড়ত্বের ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে গাইরুল্লাহকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। সুরায়ে ফাতেহা আগাগোড়া তাওহিদের বয়ান ও শিরকের প্রত্যাখ্যান। মোটকথা নামাজের প্রতিটা রুকনের মূল প্রেরণা হলো আল্লাহর প্রতি মহব্বত ও গাইরুল্লাহর প্রতি বিতৃষ্ণা।

এটা শুধু এখানেই নয়; বরং শরয়ি বিধানের এমন অনেক দৃষ্টান্ত আছে যেখানে মানুষ শিরক করতো সেটাকে ইসলাম তাওহিদের প্রচার—প্রসার এবং তার দাওয়াতের মাধ্যম বানিয়েছে। ইসলামপূর্ব যুগে মানুষ লেনদেনের ভালোমন্দ ও লাভক্ষতি নির্ণয়ের জন্য লটারি দিতো। আর লটারি অনুষ্ঠিত হতো মূর্তির সামনে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম—এর স্থলে এস্তেখারার নামাজের নির্দেশ দিয়েছেন। যে ব্যাপারে মানুষ দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগতো, কোনো ব্যাপারে স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারতো না, তখন সে দু’রাকাত নামায পড়ে আল্লাহর অভিমুখী হবে। ফলে তার জন্য যেটা মঙ্গল সেদিকে আল্লাহ পাক তার মনের গতি স্থির করে দেবেন।

এমনিভাবে মানুষ মূর্তির সামনে কুরবানি করতো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানিকে বাকি রেখেছেন কিন্তু বিশ্বাস ও ইবাদতের পদ্ধতি পরিবর্তন করে দিয়েছেন। ফলে যেটা ছিল শিরকের নিদর্শন সেটা হয়ে গেলো তাওহিদের নিদর্শন। আল্লাহর ইবাদতের রঙে রঙিন হয়ে গেলো। মুসলমানগণ পৃথিবীর যেখানে থাকুক এমনই হওয়া চাই তাদের কর্মপদ্ধতি। তারা শিরকি ধ্যান—ধারণা দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার পরিবর্তে সর্বত্র ইসলামি ধ্যান—ধারণা প্রচার করবে। সমাজ—সভ্যতাকে তাওহিদের রঙে রঙিন করার চেষ্টা করবে। নিজেরা কখনো অন্য জাতি—গোষ্ঠীর অনুসরণ করবে না।

আরবি ভাষায় সূর্যগ্রহণকে বলা হয়كسوف । একবার সূর্যগ্রহণ হলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদের নিয়ে দু’রাকাত নামায পড়েছেন। তাতে দীর্ঘ কেরাত পড়েছেন। কোনো কোনো রেওয়ায়েতের মাধ্যমে জানা যায়, প্রথম রাকাতে সুরা বাকারা ও দ্বিতীয় রাকাতে সুরা আলে ইমরান পড়েছেন। তাতে যেমন দীর্ঘ কেরাত পড়েছেন তেমনি দীর্ঘ রুকু করেছেন। হযরত আসমা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নামাজে তাঁর আচ্ছন্নের মতো অবস্থা হয়। এমনকি তাঁর মাথায় পানি ঢালতে হয়। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর থেকে বর্ণিত, তিনি যখন রুকুতে গেছেন মনে হলো তিনি রুকু থেকে উঠবেন না। রুকু থেকে উঠে আবার দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকেন। এভাবে তিনি নামাজের সবগুলো রুকন আদায় করেন।

নামাজে তিনি এতোটা ভীত বিহ্বল হয়ে পড়েন যে, কোনো কোনো রেওয়ায়েতে আছে, দ্বিতীয় রাকাতের শেষ সেজদায় তাঁর শ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। তিনি তখন কাঁদছিলেন। অন্য রেওয়ায়েতে আছে, অনিচ্ছায় তাঁর জবান মোবারকে উফ উফ শব্দ বেরিয়ে যায়। পরে তিনি আল্লাহর দরবারে কাকুতি—মিনতি শুরু করেন—হে আল্লাহ! আপনি কি আমার সঙ্গে ওয়াদা করেন নি আমি যতদিন থাকবো আপনি তাদেরকে আযাব দিবেন না! আপনি কি ওয়াদার করেন নি যতক্ষণ তারা ইস্তিগফার করবে আপনি তাদেরকে আযাব দিবেন না! মোটকথা তিনি অত্যন্ত ঘাবড়ে যান এবং বিচলিত হয়ে পড়েন। নামায শেষ হওয়ার পরও সূর্য ভালোমতো প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত তিনি পশ্চিমমুখী হয়ে দোয়া মোনাজাতে মশগুল থাকেন।

সূর্যগ্রহণের সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দোয়া, তাকবীর ও সদকার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন,

فاذا رأيتم ذلك فادعوا الله وكبروا وصلوا وتصدقوا .

‘যখনি তোমরা তা দেখবে আল্লাহর কাছে দোয়া করবে, তাঁর বড়ত্ব প্রকাশ করবে, নামায পড়বে এবং সদকা দেবে।’ তখন তাকে জান্নাতের নেয়ামত ও জাহান্নামের বিভীষিকা দেখানো হয়েছে। জান্নাতের চমকপ্রদ দৃশ্য এমন ছিল যে, তিনি অনিচ্ছায় নামাজে দু’কদম অগ্রসর হয়ে যান। আবার জাহান্নামের বিভীষিকা এমন ছিল যে, তিনি দুকদম পিছিয়ে যান। এজন্য তিনি বিশেষভাবে তখন সাহাবিদের বলেন, তারা যেনো কবরের আযাব থেকে বাঁচার জন্য দোয়া করে।

কারণ সুস্পষ্ট; সূর্যের মতো উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক যার মাধ্যমে পৃৃথিবীর প্রতিটি অনু—পরমাণু তাপ ও আলো লাভ করে, আল্লাহর অপার কুদরতে সেই সূর্য অন্ধকার হয়ে গেলো। কারণ সূর্য ও পৃথিবীর মাঝখানে চন্দ্র কিছুক্ষণের জন্য আড়াল হয়ে গেছে, যেটা সাধারণত হয় না। যদি আল্লাহ পাক গ্রহ—নক্ষত্রের আবর্তনের বিধান পরিবর্তন করে দেন যার ফলে সবসময় এমনি থাকে তাহলে পৃথিবীর তাপ ও আলো পাবে কোথায়?

তাছাড়া সূর্য যদি নিজের কক্ষপথ থেকে সরে যায়, পৃথিবীর নিকটে চলে আসে, সূর্য পৃথিবীকে নিজের দিকে টেনে নেয়, তখন তো কেয়ামতই হয়ে যাবে। এটা আল্লাহ পাকের অপার কুদরত যে, মহাশূন্যের বিভিন্ন গ্রহ—উপগ্রহের মাঝে এমন আকর্ষণ রয়েছে যার ফলে সেগুলো পরস্পর নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে ঘুরে বেড়ায়। একটির সঙ্গে অন্যটি সংঘর্ষ বাধে না। এজন্য সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণের ঘটনা কেয়ামত, কবর ও আখেরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণ সম্পর্কে জনগণের মাঝে প্রচলিত যেসব কুসংস্কার আছে ইসলামের সঙ্গে সেসবের কোনো সম্পর্ক নেই। তবে হ্যা, মেডিকেল সাইন্স মানুষের দৃষ্টিশক্তি ও গর্ভজাত সন্তানের ওপর এর প্রভাব স্বীকার করে। এ ব্যাপারে ডাক্তারগণ এবং চিকিৎসা—বিজ্ঞানীরা ভালো বলতে পারবেন। কিন্তু জনগণের মাঝে যে কথা প্রচলিত আছে, ইসলামের দৃষ্টিতে সূর্যগ্রহণের সময় গর্ভবতী মহিলাদের জন্য কিছু বিধি—নিষেধ আছে, এটা ঠিক নয়। ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গির খোলাসা এটাই, তখন খেল—তামাশা ও আনন্দ—ফুর্তির পরিবর্তে আল্লাহর দিকে রুজু করা এবং দোয়া—মোনাজাত করা উচিত। এতে ঈমান তাজা হবে; আল্লাহর বিশ্বাস মজবুত হবে। আখেরাতের ভয় এবং আল্লাহর স্মরণের উপায় হবে। এটাই সূর্যগ্রহণের আসল পয়গাম।

কুরআন শরীফ শিক্ষা করা শ্রেষ্ঠতম রহমত

আদর্শ সেনানায়ক মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। ড. এ. কে. এম. আইয়ুব আলী

সূর্যগ্রহণ সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি

সূর্যগ্রহণ সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি

Leave a Reply

Your email address will not be published.