মাহে জিলহজ্ব করনীয় ও বর্জনীয়

মাহে জিলহজ্ব ও কুরবানীর ফযীলত করণীয় ও বর্জনীয়

আত্মশুদ্ধি ইবাদত ইসলাম প্রতিদিন প্রবন্ধ সংস্কৃতি

মাহে জিলহজ্ব ও কুরবানীর ফযীলত করণীয় ও বর্জনীয়

কুরআনে কারীমে চারটি মাস সম্মানিত বলে উল্লেখ আছে। মাস চতুষ্টয় হলো জিলকদ, জিলহজ্ব, মহররম এবং রজব। সহীহ বুখারী। এই চার মাসের অন্যতম হল জিলহজ্ব মাস।  জিলহজ্ব মাসের প্রথম দশকের গুরুত্ব ও মাহাত্ম অপরিসীম। কেননা আল্লাহ তা‘আলা এই দশকের রাত্রির শপথ করেছেন। -সুরা ফাজর। হাদীসে হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ তা‘আলার নিকট জিলহজ্বের দশ দিনের নেক আমলের চেয়ে অধিক প্রিয় অন্য কোন দিনের আমল নেই।

সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদও নয়? উত্তরে বললেন, না আল্লাহর রাস্তায় জিহাদও নয়। তবে হ্যাঁ, যদি কোন ব্যক্তি নিজের জান ও মাল নিয়ে বের হয় আর তার কোন কিছুই নিয়ে ফিরে না আসে। অন্য এক হাদীসে এসেছে দুনিয়ার সর্বোত্তম দিনগুলো হল জিলহজ্ব দশ দিন।

এ মাসটি হজ্জের মাস। শুধু হজ্জ ও কুরবানীই এ মাসের ফযীলতকে বহুগুনে বৃদ্ধি করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। এর সাথে মাসের প্রথম দশকের ফযীলত স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য মন্ডিত। কাজেইএ পবিত্র মাস সম্পর্কিত আমাদের করণীয় আমল সমূহ যত্নের সাথে আদায় করা এবং বর্জনীয় বিষয় থেকে গুরুত্বের সাথে বেঁচে থাকা অতীব জরুরী।

১. আল্লাহ তা‘আলা যাদেরকে হজ্জ পালন করার মত সামর্থ দিয়েছেন তারা সর্বাগ্রে এ ফরজ দায়িত্ব আদায় করা। শরয়ী ওজর ব্যতীত হজ্জকে কোন ভাবে না পেছানো। জানা নেই কখন মৃত্যু এসে যাবে তাহলে ফরজ হজ্জ রেখে মারা গেলে হাদীসের ভাষা মতে তার মৃত্যু হবে ইয়াহুদ-নাসারাদের মৃত্যু তুল্য। উম্মতের গন্ডি থেকে সে বহির্ভূত।

২. আপনার উপর হজ্জ ফরজ কিনা? বিজ্ঞ আলেমদের সাথে পরামর্শ করুন। অনেকে সামর্থবান হওয়া সত্ত্বেও নিজেকে অসামর্থ মনে করে থাকে। যাদের আর্থিক স্বচ্ছলতা নেই তাদেরও  বাইতুল্লাহ যিয়ারত ও রওযা পাকে হাজিরীর আবেগ থাকা ঈমানের পরিচায়ক। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, “যে ব্যক্তি হজ্জ করে আমার কবর যিয়ারত করবে, সে যেন জীবিত অবস্থায় আমার সাথে সাক্ষাৎ করল।” বায়হাকী।

৩. যাদের উপর যাকাত ফরয। তাদের উপর কুরবানী ওয়াজেব। যাকাত ছাড়াও কোনো কোনো লোকের উপর কুরবানী ওয়াজেব হয়, তা কোন ভাল অভিজ্ঞ আলেমের নিকট জিজ্ঞাসা করে নিবেন। তাছাড়া যার কুরবানী ওয়াজেব নয় সে যদি নিজ, নাবালেগ সন্তানদের তরফ থেকে কুরবানী করে তবে তাতে বহু সওয়াব পাবে। মৃত ব্যক্তির তরফ থেকে করলেও সে অনেক সওয়র পাবে। আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তরফ থেকেও কুরবানী করা অতি উত্তম আমল।

৪. খালেস নিয়্যতে, আন্তরিক ভক্তি এবং সওয়াবের আশায় কুরবানী করবেন। কুরবানীর জানোয়ারের রক্ত বিন্দু, হাড্ডি এবং প্রতিটি পশমের বিনিময়ে সওয়াব পাওয়া যাবে। আল্লাহ তা‘আলা সুরা কাওসারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাকীদ করিয়া বলেছেন, আপনি আপনার রবের উদ্দেশ্যে নামায পড়–ন এবং কুরবানী করুন। সুতরাং কুৃরবানীতে কোন নাম, যশ, খ্যাতি বা শুধু গোশত খাওয়ার উদ্দেশ্যে কুরবানী না করা।

৫. কুরবানী খুবই আন্তরিক ভক্তি ও আগ্রহের সাথে করা, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের সাথে যাতে না হয়। সম্ভব হলে নিজ হাতে আর অক্ষম হলে সম্মুখে দাঁড়াইয়া ইবরাহীমী (আ:) জযবা ও ত্যাগ নিয়া কুরবানী করা।

৬. যিলহজ্জ মাসের প্রথম দশক অর্থাৎ ঈদের দিন ব্যতীত বাকী নয় দিন রোযা রাখার বিশেষ ফযীলত  হাদীস শরীফে বর্ণিত রয়েছে। এছাড়া আরাফার দিনের রোযার ব্যাপারে  হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে- যে ব্যক্তি আরাফার দিন রোযা রাখবে তার আগে পরে এক বছরের গুনাহ মাফ করে দিবেন।

সহীহ বুখারী শরীফে আছে এ দিন ও রাতে বিশেষভাবে ইবাদত আল্লাহ তা‘আলার দরবারে সবচেয়ে বেশী প্রিয়। কাজেই রোযা, নামায, তাসবিহ, তিলওয়াত, সদকা-খায়রাত যাবতীয় নেকীর কাজে বিশেষভাবে যত্নবান হওয়া উচিত।

৭. যিলহজ্ব মাসের নয় তারিখের ফজরের নামায থেকে ১৩ তারিখের আসর নামায পর্যন্ত তাকবীরে তাশরীক পুরুষগণ উচ্চস্বরে আর মহিলাগণ অনুচ্চস্বরে একবার পড়া ওয়াজিব। তাকবীরে তাশরীক হলো “আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ।” ফরজ নামাযের পর কথা না বলে একবার তাকবীরে তাশরীক পড়তে হবে। অনেকেই তিনবার পড়াকে ওয়াজিব মনে করে অথচ তা ঠিক নয়।

৮. আমাদের দেশে চাঁদের হিসাবে যে দিন নয় তারিখ হয় সে দিন রোযা রাখা।

৯. যারা কুরবানী করবেন যিলহজ্জ মাসের প্রথম থেকে কুরবানী করা পর্যন্ত চুল, গোফ, নখ কর্তন না করা সুন্নত।

এ মাসে বর্জনীয় কাজ সমূহ

যিলহজ্জ মাস যেহেতু বিশেষ মর্যাদাশীল ও ফযিলত পূর্ণ , তাই এ মাসের পবিত্রতা, সম্মান রক্ষা করা জরুরী।  এ মাসের দিনগুলোতে ইবাদত বন্দেগীর যেমন বিশাল সওয়াব রয়েছে গুনাহ করলে শাস্তিও ভয়াবহ হবে।

১. কুরবানী  যেহেতু নিখাদ একটি ইবাদত, তাই এখানে নিয়তের পরিশুদ্ধি অপরিহার্র্য্য । শুধু রেওয়ায হিসাবে নয়, ইবাদতের নিয়তে কুরবানী করা। আল্লাহর নামে কুরবানী করা। আমার নামে, মা-বাবার নামে  অথবা শরীকদের নামে কুরবানী করছি এমনটি না বলা।

২. কুরবানী পুরুষ-মহিলা উভয়ের উপর ওয়াজিব। অনেকেই মনে করে মহিলাদের উপর কুরবানী ওয়াজিব নয়। তাই উলামায়ে কেরামের দায়িত্ব ও কর্তব্য হলো-সময়ের তাকাযা অনুযায়ী দ্বীনের জরুরী বিষয় নিয়ে আলোচনা করা। যেমন: কুরবানীর সময় কুরবানীর মাসায়েল, হজ্বের মাসে হজ্বের মাসায়েল, রমযানে রোযা ও তারাবিহর মাসায়েল ইত্যাদি সম্পর্কে আলোচনা করা।

৩. কেবলমাত্র গোশত খাওয়ার উদ্দেশ্যে , মেয়ের জামাইর বাড়ীতে গোশত দিতে হবে এধরণের হীন উদ্দেশ্যে কুরবানী না করা। আল্লাহ তায়ালা কুরবানীর গরু, উটকে ইসলামের প্রতীক বলে উল্লেখ করেছেন। এক্ষেত্রে বিভিন্ন রোগের কারণে গরুর পরিবর্তে মহিষ কুরবানী করা। মহিষের গোশত চর্বি কম ইত্যাদি বলা সহিহ নিয়তের পরিপন্থী।

৪. ঈদ উপলক্ষে আনন্দ ফুর্তির মানসে গুনাহের সরঞ্জাম যোগায় টিভি, ডিশের সংযোগ গান বাজনার আয়োজন, কনসার্টের আয়োজন, অংশগ্রহণ, সমুদ্র সৈকত, দেশ বিদেশে ভ্রমণ, খেলাধুলার প্রতিযোগিতা, নাটক থিয়েটারের আয়োজন এগুলো থেকে কঠোরভাবে নিজে এবং সন্তান পরিবারের সকলকে বিরত রাখা।

৫. ইসলামের উদ্দেশ্য আদর্শ বহির্ভূত বিজাতীয়দের কৃষ্টি-কালচারের অনুসরণের মাধ্যমে ঈদ উদযাপন না করা । ইসলামের গন্ডির মধ্যে থেকে ঈদের আনন্দ-খুশি উপভোগ করা।

৬) ঈদুল আযহার নামায প্রত্যেক সুস্থ মস্তিষ্ক পুরুষের উপর ওয়াজিব। মেয়েদের উপর ওয়াজিব নয়। মেয়েরা ঈদের নামাযের জন্য ঈদগাহে যাবে না। মসজিদে জামাতেও শরীক হবে না।

৭. অনেকেই অজ্ঞতা বশত ঈদের দিনে রোযা রাখে। অথচ ঈদের দিনে রোযা রাখা হারাম।

৮. ঈদের নামাযের পূর্বে বাড়ীতে বা ঈদগাহে কোন নফল নামায পড়া জায়েজ নেই। তাই এ থেকে বিরত থাকতে হবে।

৯. শরীকানা কুরবানীতে সকল শরীকদের নিয়ত খালেছ থাকা জরুরী ও সকলের মাল হালাল হতে হবে। অন্যথায় কারো কুরবানী সহীহ হবে না।

১০. উট, গরু ও মহিষে সর্ব্বোচ্চ সাত জনের পক্ষ থেকে কুরবানী করা যাবে। সর্বনিম্ন একজন। এক অংশের কম কুরবানী সহীহ নয়। দু’জন মিলে এক অংশের কম কুরবানী করলে কুরবানী সহীহ হবে না।

ঈদের দিনের সুন্নাত

১. অতি প্রত্যুষে ঘুম থেকে উঠা।

২. মিসওয়াক করা।

৩. গোসল করা।

৪. সামর্থ্য অনুযায়ী উত্তম পোশাক পরিধান করা।

৫. খুশবু ব্যবহার করা।

৬. শরীয়তের সীমার ভিতর থেকে যথাসম্ভব সজ্জিত হওয়া।

৭. ফজরের নামাযের পর জলদি জলদি ঈদগাহে উপস্থিত হওয়া।

৮. ঈদুল ফিতরের দিনে ঈদগাহে যাওয়ার পূর্বে খোরমা অথবা অন্য কোনো মিষ্টি দ্রব্য খাওয়া। ঈদুল আযহার দিনে নামাযের পূর্বে কিছু না খাওয়া।

৯. ঈদুল ফিতরে ঈদগাহে যাওয়ার পূর্বেই সদকায়ে ফিতর আদায় করা।

১০. ঈদের নামায ঈদগাহে পড়া।

১১. ঈদগাহে হেঁটে যাওয়া।

১২. ঈদগাহে এক পথে যাওয়া এবং অন্য পথে আসা।

১৩. ঈদুল ফিতরে অনুচ্চস্বরে এবং ঈদুল আযহায় উচ্চস্বরে তাকবীরে

 তাশরীক বলতে বলতে ঈদগাহে যাওয়া। তাকবীরে তাশরীক হলো- “আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ।”

অর্থ:- আল্লাহ সবচেয়ে বড়, আল্লাহ সবচেয়ে বড়, আল্লাহ ছাড়া কোন মাবূদ নেই। আল্লাহ সবচেয়ে বড়, সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য।

——————————————————————————-

“আল কুরআনের আদব” বিষয়ে পড়তে ক্লিক করুন

কুরআনুল কারিমের কথা” প্রবন্ধটি পড়তে ক্লিক করুন

আরো জানতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েব সাইট রাহে সুন্নাত ব্লগ

https://youtu.be/Kr-iXBxuypk

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *