প্রযুক্তি : বদলে দিয়েছে জীবনধারা || মুফতি আবু তাহের মিনহাজ || Rahe Sunnat-রাহে সুন্নাত

ইসলাম প্রতিদিন তথ্য ও প্রযুক্তি বিবিধ
প্রযুক্তি : বদলে দিয়েছে জীবনধারা

 

আবু তাহের মিনহাজ

 

উইকিপিডিয়া বলছে, প্রযুক্তি হচ্ছে, ‘কোন একটি প্রজাতির বিভিন্ন যন্ত্র এবং প্রাকৃতিক উপাদান প্রয়োগের ব্যবহারিক জ্ঞান।’ অবশ্য ‘মানব সমাজের প্রেক্ষিতে বলা যায়, প্রযুক্তি হল কিছু প্রায়োগিক কৌশল যা মানুষ তার প্রতিবেশের উন্নয়নকার্যে ব্যবহার করে।’ অনেকে আরো সহজ করে বলেন, বিজ্ঞানের আবিষ্কারকে মানুষের প্রায়োগিক কাজে লাগানোর উপায়কে প্রযুক্তি বলে।
চলমান শতাব্দীকে বলা হয় বিজ্ঞানের উৎকর্ষ সাধনের যুগ। বিজ্ঞানের আবিষ্কারের সামনে মানুষের কল্পনাও হার মানছে। আর আমাদের বাস্তবজীবনে এসব আবিষ্কারের প্রয়োগকে আমরা প্রযুক্তির ব্যবহার বলি। আজকাল পুরো বিশ্ব প্রযুক্তির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে। গ্রামের একেবারে সাধারণ মানুষ থেকে শহুরে সর্ব্বোচ্চ শিক্ষিত পর্যন্ত প্রযুক্তির ব্যবহার ছাড়া প্রাত্যহিক জীবন চলাই মুশকিল হয়ে পড়বে। সাম্প্রতিক সময়ের মানুষ বলতে গেলে প্রযুক্তি নির্ভর হয়ে পড়েছে। অবশ্য এসব প্রযুক্তির ব্যবহার মানুষের বাস্তবজীবনে আলাদা গতি সঞ্চারিত করেছে। জীবনকে করে তুলেছে সহজ, মোহনীয় ও উপভোগ্য। কর্মতৎপরতায় বহু কষ্ট দূর করে দিয়েছে। পারস্পরিক যোগাযোগব্যবস্থায় এনেছে বিপ্লবিক উন্নয়ন। যাতায়ত ক্ষেত্রে যোগ করেছে বিস্ময়কর আবিষ্কার। ঘন্টার পর ঘন্টা সময় ব্যয় করে আগে যে কাজ করতে হয়েছে, প্রযুক্তি ব্যবহার করে আজকাল খুব অল্প সময়েই সে কাজ সম্পাদন করা যায়। গত শতাব্দীর তুলনায় চলমান শতাব্দীতে মানুষের জীবনধারা, কাজকর্ম ও চিন্তা-চেতনায় বিরাট পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। এই পরিবর্তনের অন্যতম কারণ প্রযুক্তির ব্যবহার। আধুনিক প্রযুক্তির বদৌলতে পৃথিবী এখন হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। পৃথিবীর এক প্রান্তের খবরাখবর অন্য প্রান্তে মূহুর্তেই চলে যায়। একটি কম্পিউটার, ল্যাপটপ, কিংবা স্মার্টফোনের সাহায্যে নিজের ঘরে বসে পুরো দুনিয়া বেড়ানো যায়।

 

আধুনিক প্রযুক্তির অন্যতম প্রকার হচ্ছে, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বা আইসিটি। কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ট্যাব, টেলিভিশন, মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট ইত্যাদি আইসিটির অন্তর্ভুক্ত। আইসিটির মাধ্যমে যোগাযোগব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন এসেছে। একটা সময় চিঠির মাধ্যমে যোগাযোগ করা হতো। সে ধারা ভেঙ্গে দিলো প্রযুক্তির মোবাইল ফোন। পরবর্তীতে আরো উন্নত প্রযুক্তি সংযোজন হলো। ইন্টারনেট সুবিধা এলো। এখন স্মার্টফোনের মাধ্যমে ফেইসবুক, মেসেঞ্জার, টুইটার, স্কাইপ, ইমু, ওয়াটসআপ, ইনস্ট্রাগ্রামসহ আধুনিক সব যোগাযোগমাধ্যম সবার হাতে হাতে। ফলে দেশ-বিদেশে খুব সহজে পরস্পর যোগাযোগ করা যায়।

 

আইসিটির ব্যবহার জীবনধারায় সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করেছে। তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও আদানপ্রদানে তথ্য প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ ও আরামদায়ক করে তুলেছে। ফলে গুগল, উইকিপিডিয়া, ইয়াহু ইত্যাদি ইন্টারনেটভিত্তিক তথ্যভাণ্ডার দ্বারা সহজে উপকৃত হওয়া যায়। কম্পিউটার, পেনড্রাইভ, সিডি, ডিভিডি ও মেমোরিকার্ড ইত্যাদির মাধ্যমে বিশাল তথ্যভাণ্ডার সংরক্ষণ করা যায়। তাছাড়া ই-মেইল, এসএমএস ও অন্যান্য যোগাযোগমাধ্যমে অল্প সময়েই তথ্যের আদানপ্রদান করা যায়। অধিকন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করে তরুণরা ব্যবসার নিত্যনতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করে সফল হচ্ছেন। এতে করে কর্মসংস্থানও তৈরি হচ্ছে। এছাড়াও মোবাইলব্যাংকিং জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বিকাশ, রকেট, সিওরক্যাশ ইত্যাদি একেবারে গ্রামেগঞ্জে ছড়িয়ে পড়েছে।

 

আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারিক বর্ণনা অনেক দীর্ঘ। সবগুলো উল্লেখ করা সংক্ষিপ্ত পরিসরে সম্ভব নয়। নিজেদের চারপাশে তাকালেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রযুক্তিনির্ভর প্রজেক্টরের মাধ্যমে পাঠদান দেয়া হয়। শিক্ষাবোর্ডের ফলাফল প্রকাশ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিআবেদন ইত্যাদি সবক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার। যাতায়ত ক্ষেত্রে পাঠাও, উবার ও অন্যান্য সুবিধায় নাগরিকজীবনে বহু কষ্ট লাগব হয়েছে। কৃষি খাতে প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বদলে গেছে আগেকার বহু দৃশ্য। হালচাষ, পানিসেচ, বীজ উৎপাদন, ধানের চারা রোপন, পাকাধান কর্তন ও মাড়াই দেওয়া; বলতে গেলে সবখানেই বিজ্ঞান দিয়েছে নতুন নতুন আবিষ্কার। ফলে ফসল উৎপাদন বহুগুণ বেড়েছে।
কিন্তু এসব ইতিবাচক দিকের পাশাপাশি অসংখ্য নেতিবাচক দিক রয়েছে। প্রযুক্তির ভয়াল থাবায় আক্রান্ত হয়ে যুব সমাজ ধ্বংসের পথে। অশ্লীল, নোংরা ও খারাপ ভিডিও হাতের নাগালে পেয়ে তরুণপ্রজন্ম আজ নৈতিকতা হারিয়ে বসছে। অপরাধপ্রবণতা দিনদিন বেড়েই চলছে। প্রযুক্তির কুপ্রভাব শিশুকিশোরদের উপরও পড়ছে। অনেকেই প্রযুক্তির প্রতি আসক্ত হয়ে লেখাপড়া ছেড়ে দিচ্ছে। তাছাড়া সহজতার কারণে বর্তমান প্রজন্মকে অলসতা গ্রাস করছে। সময়ের অপব্যবহার, অপচয় করা হচ্ছে। প্রযুক্তির সুযোগ কাজে লাগিয়ে বড় বড় ক্রাইম সহজেই সংঘটিত হচ্ছে। সুতরাং প্রযুক্তি আমাদের জীবনে আশীর্বাদ হলেও নৈতিক অবক্ষয় ও চারিত্রিক স্খলনের কারণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *